আখতারুজ্জামানের জামিন শুনানিতে এজলাসে হট্টগোল, বাইরে হাতাহাতি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এদিন শুনানি চলাকালে এজলাসের ভেতরেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
রোববার (৪ অক্টোবর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালত এই নির্দেশ দেন।
একদিন রিমান্ড শেষে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে পুলিশ আখতারুজ্জামানকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে বেলা আড়াইটার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট ও হাতকড়া পরিয়ে তাকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়।
দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসন গ্রহণ করার পরই মামলাটির নম্বর ধরে ডাকা হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে বাকবিতন্ডা হলে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং হাতাহাতি শুরু হয়। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নিলে বিচারক মাত্র দুই মিনিটের মাথায় এজলাস ছেড়ে কক্ষে চলে যান।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরিবেশ শান্ত হলে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে বিচারক পুনারায় এজলাসে ওঠেন।
কাঠগড়ায় স্লোগান ও 'বাতিল মাল' মন্তব্যের প্রতিবাদ
বিচারক পুনারায় আসন নিলে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো অবস্থায় আখতারুজ্জামান বলেন, '১০ জন আইনজীবী আমার পক্ষ থেকে শুনানি করবেন, এর অনুমতি চাই।'
এদিকে রিমান্ড পরবর্তী এক ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী আসামিকে 'বাতিল মাল' বলে মন্তব্য করেছেন—এমন অভিযোগ তুলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এজলাসে তীব্র প্রতিবাদ জানান। উভয়পক্ষ পুনরায় উত্তেজিত হয়ে উঠলে বিচারক তাদের শান্ত করেন।
অবশেষে জামিন নামঞ্জুরের আদেশ শোনার পর আখতারুজ্জামান এজলাসে বসেই 'আল্লাহু আকবার' বলে স্লোগান দেন। পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত আইনজীবীরা তাকে শান্ত করেন।
এজলাসের এই ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা শুনানির শেষে আদালতের বাইরে সিএমএম কোর্টের সামনের রাস্তাতেও গড়ায়। সেখানেও বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা কয়েক মিনিটব্যাপী হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কিতে লিপ্ত হন। পরে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাজেদুল ইসলাম আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানিয়ে আদালতে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্যাদি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসেকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের কঠোর বিরোধিতা করে বলেন, 'আখতারুজ্জামান নিজেকে বাঁচাতে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। তিনি বিমানবন্দরে এমনভাবে জমজমের পানি নিক্ষেপ করেছেন, যা টিভিতে সবাই দেখেছে। জমজমের পানি নিক্ষেপ এবং সেখানে অংশগ্রহণ হয়তো তার পরিকল্পিত। কোথায় সরকারকে গালাগালি করা যায় সেটা নিয়ে তারা ব্যস্ত। তিনি সেখানে কর্তব্যরত কর্মকর্তা কামাল উদ্দিনকে শারীরিকভাবে অপমান করেছেন। প্রতিবাদ কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু এর ভাষা এবং ধরন যদি অস্বাভাবিক হয় তাহলে সেটা অবশ্যই অপরাধ।'
জামায়াতের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে পিপি আরও বলেন, 'আমাদের মধু খেয়ে আপনারা বেঁচে ছিলেন। বিএনপি এদেশের বহু লোককে জন্ম দিয়েছে। অনেকে আমাদের ভুলে যায়।'
আসামিপক্ষের যুক্তি
অন্যদিকে জামিন আবেদনের পক্ষে আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি তুলে ধরে বলেন, 'কয়েকবারের সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান কেবল বিমানবন্দরে মালামাল বহনের ট্রলি না থাকায় অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সেখানে সিনিয়ারদের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন মাত্র। সিসিটিভি ফুটেজেও শারীরিক আঘাতের কোনো প্রমাণ মেলেনি।'
তিনি আরও দাবি করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলা দেওয়া হয়েছে। আসামি মারাত্মক অসুস্থ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে ভুগছেন। মামলার একটি ধারা ছাড়া সবকটিই জামিনযোগ্য। তাই যেকোনো শর্তে তার জামিনের আবেদন জানান তারা।
উল্লেখ্য, গত ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টসংলগ্ন ধামাল কোর্ট এলাকার নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন ৩ অক্টোবর আদালত তাকে একদিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
