ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির রিপোর্ট সংসদে উত্থাপন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে। এরপর আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানে ১৮তম সংশোধনী বিল আনা হবে।
আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকালে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে জুলাই সনদে সই করা রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সংগঠনের প্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্য ধারণ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য কমিটি এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, 'জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে এবং আরও কিছু পরিপূরক প্রস্তাব যদি আসে, যেগুলো জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ, সেসব বিষয় আমরা পরামর্শ আকারে নেব। তারপরে আমাদের রিপোর্ট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব। আমরা খুব দ্রুতগতিতে এগোতে চাই। সম্ভব হলে আমরা প্রতি সপ্তাহে একটি করে বৈঠকের আয়োজন করব।'
'বিরোধী দল না এলেও প্রক্রিয়া একপাক্ষিক নয়'
বৈঠকে সংসদের বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক কোনো দলই অংশ নেয়নি।
বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে অংশ না নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া একপাক্ষিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'না, একপাক্ষিক হচ্ছে না।'
তিনি বলেন, 'যারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি, তারা আলোচনায় অংশ নিতে চাইলে তাদের জন্যও সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ আলোচনায় অংশ নিতে চাইলে, তাদের বক্তব্যও নেওয়া হবে।
এদিকে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের সরকারি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১–দলীয় ঐক্যের এই অবস্থানের কথা জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগ ১১–দলীয় ঐক্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
১৬ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সরাসরি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। একটি রাজনৈতিক দল লিখিত বক্তব্য দিয়েছে এবং আরেকটি দলের প্রতিনিধি শেষ মুহূর্তে অসুস্থতাজনিত কারণে উপস্থিত হতে পারেননি।
'স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব'
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, এই জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই বাস্তবায়ন করব।
সনদের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা তথা সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। সনদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলোর তালিকা রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। এসবের অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কিছু বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা বাকি রয়েছে।
দ্রুত সংবিধান সংশোধনী রিপোর্ট দেওয়ার পরামর্শ
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, 'সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই কমিটিকে যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যতটা দ্রুত সম্ভব আলোচনা শেষ করে আমরা সংসদে রিপোর্টটা পেশ করি এবং সংবিধান সংশোধনী গ্রহণ করি। সবার সঙ্গে আলোচনা করি, সমঝোতার মাধ্যমে করি। তাহলে জাতি বুঝতে পারবে যে জুলাই জাতীয় সনদ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে।'
জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা কিছু বিষয়ও সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, 'জুলাই জাতীয় সনদের বাইরেও কিছু কিছু অঙ্গীকার আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারের মধ্যে ছিল, যেগুলোর পক্ষে জনগণ ভোট দিয়েছে, সেগুলো আমরা ধারণ করব।'
উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি তুলে ধরে কমিটির সভাপতি বলেন, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত রয়েছে। কেউ সংসদে পাওয়া আসনের অনুপাতে, আবার কেউ ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'যেহেতু আমরা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি, জনগণের ম্যান্ডেট হয়েছে। আমরা সেভাবে যাব। এটাই ছিল নোট অব ডিসেন্টের বিষয়।'
'জুলাই সনদ নিয়ে কিছু দল বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে'
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল মাঠের রাজনীতিতে প্রচারণা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে যে, বিএনপি সংখ্যাধিক্যের কারণে তারা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না। যেটা সম্পূর্ণ অসত্য। আমরা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করব। যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই আমরা যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান সংশোধন এটা নিয়ে আসার চেষ্টা করব। আলাপ-আলোচনা আমাদের চলতে থাকবে।
সংস্কার ও সংশোধন প্রসঙ্গ
সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে কোনো সংশোধনী গ্রহণ করা হলে, সেটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না- এমন ধারণা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে যদি কোনো সংশোধনী গৃহীত হয়, সেটা সংশোধন গৃহীত হবে, সংস্কার গৃহীত হবে। কারণ, আমাদের আইনমন্ত্রী পার্লামেন্টে প্রতিটি সংশোধনীকে একটা সংস্কার বলেছেন। কিন্তু প্রতিটি সংস্কার সংশোধনীতে আসে না।'
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু সংস্কার আইন, কিছু বিধি-বিধান এবং কিছু নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে হতে পারে। তবে যে সংস্কার সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে হবে, সেটি সংশোধনী হিসেবেই বিবেচিত হবে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্ন আলাদা। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান রয়েছে, তাই নতুন সংবিধানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভা বর্জন
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার প্রতিবাদ জানিয়ে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা বর্জন করেছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। বৈঠকে যোগ দিয়ে একপর্যায়ে বের হয়ে যান রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দুই প্রতিনিধি।
