আইন লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে বিএনপি নেতা ইদ্রিসকে নিয়োগ
চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আগামী তিন বছরের বিএনপি নেতা মো. ইদ্রিস মিয়াকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে আইন অনুযায়ী বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ার কথা। ফলে বোর্ড সদস্য না হয়েও চেয়ারম্যান পদে তার নিয়োগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ-৩ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আকতারুন নেছার সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন ২০২৬ এর ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, বোর্ডের একজন চেয়ারম্যান থাকবেন যিনি সরকার কর্তৃক সদস্যগণের মধ্য থেকে নিযুক্ত হবেন।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ অধিশাখা যুগ্মসচিব আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ''সরকার চাইলে যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। আইন অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি এই দায়িত্বে নতুন। কাগজপত্র দেখে বিস্তারিত রোববার জানাতে পারব।''
বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি কমিটি রয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধিকে আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম ওয়াসার সচিবকে সদস্যসচিব করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটিতে সদস্য হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রতিনিধি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, ছাত্র প্রতিনিধি, পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে। এছাড়া পদাধিকারবলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও বোর্ডের সদস্য।
ওই সময় মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ এর ৪২ক (২) ধারার বিধান অনুযায়ী চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মসম্পাদনে সহায়তার লক্ষ্যে এসব কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নির্দেশক্রমে একটি কমিটি গঠন করা হলো। অধ্যাদেশের ৪২ক (২) ও (৩) ধারার বিধান অনুযায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ বোর্ডের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। অন্তর্বতী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশটিই চলতি বছরে ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অনুমোদনে আইনে রূপান্তর হয়।
ফলে আইন অনুযারী বিদ্যমান বোর্ড থেকেই চেয়ারম্যান নিয়োগের কথা। কিন্তু বোর্ডের বাইরে থেকে এবার চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ অনুবিভাগের যুগ্মসচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ্ খান, সিনিয়র সহকারী সচিবের মোছা. আকতারুন নেছার নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
চেয়ারম্যান পদে নতুন নিয়োগ করা ইদ্রিস মিয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত ৫৪ সদস্যের জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। এর আগে তিনি পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ৬ ধারায় বোর্ডের গঠন প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে, সরকার মনোনীত ব্যক্তি, চেম্বার অব কমার্স, সিটি কর্পোরেশন, পেশাজীবী সংস্থা ইত্যাদি থেকে আসা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠিত হবে। তাদের থেকে একজনকে বোর্ড চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেবে সরকার— বলা হয়েছে আইনের ৭(১) ধারায়।
আইনের ১৩ ধারা অনুসারে চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্যরা বোর্ডের সভায় যোগদান করার জন্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত ফি বা সম্মানি পান। তারা নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মকর্তা নন। অর্থাৎ, চেয়ারম্যান পদটি কোনো চাকুরিজীবী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ নয়। এটি একটি প্রতিনিধিত্বমূলক ও নীতি নির্ধারণী পদ।
এর আগে বোর্ড সদস্য হিসেবে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এসএম নজরুল ইসলাম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার দুজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করা শর্তে টিবিএসকে বলেন, ''বোর্ড সদস্যরা মূলত ওয়াসার নীতি নির্ধারণ, প্রণয়ণ করে থাকেন। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেন। বোর্ড সদস্যদের বাইরে চেয়ারম্যান নিয়োগ আগে দেখিনি। আর চেয়ারম্যান পদটিতে উপাচার্য ও প্রকৌশল খাতে অভিজ্ঞ শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম সংশ্লিষ্ট খাতে পেশাগত উৎকর্ষ নেই এমন একজন নিয়মবহির্ভূতভাবে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।''
আইনের ২৮ ধারা অনুসারে সংস্থাটির বেতনভুক্ত সার্বক্ষণিক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। এ পদে বর্তমানে আছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (এ্যাব) চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম। চলতি বছরে ২১ মে তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি পদ থেকে একেএম ফজলুল্লাহকে অপসারণের পাশাপাশি তৎকালীন বোর্ড বাতিল করা হয়। এরপর এ পদে পর্যায়ক্রমে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন স্থানীয় সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা ও মনোয়ারা বেগম।
