৬ মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ সরকারের, শিক্ষক সংকট কাটাতে দেবে প্রণোদনা
চলতি অর্থবছরে ৬টি মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু করতে উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্গঠন করছে সরকার। পাশাপাশি সারা দেশে মৌলিক বিষয়গুলোর শিক্ষক সংকট নিরসনে প্রণোদনা ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ ও নার্সিং কলেজের পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মেডিকেলের মৌলিক বিষয়গুলোতে আরও শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আকৃষ্ট করতে এবং অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পুনরায় কাজে ফিরিয়ে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন টিবিএসকে বলেন, যেসব মেডিকেল কলেজের এখনও নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, সেগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা সরকারের অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, 'অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ, অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ ও নার্সিং কলেজের পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।'
নাজমুল হোসেন আরও বলেন, সম্প্রতি মাগুরা, নওগাঁ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একটি কর্মশালা হয়েছে। এসব কলেজের জন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রস্তুত করা খসড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন করা হবে।
তিনি বলেন, 'তখন বড় বড় প্রকল্প করার প্রবণতা ছিল। এখন আমরা বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনায় যাচ্ছি, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় এবং সরকারের অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।'
দেশে এখন মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ১১০টি। এর মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ আছে ৩৭টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৬৭টি, আর্মি মেডিকেল কলেজ ৫টি ও আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ ১টি।
বর্তমানে মাগুরা, নওগাঁ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর, নীলফামারী ও রাঙ্গামাটি—এই ৭ সরকারি মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই।
তবে কোন ৬টি কলেজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা এখনও নিশ্চিত করেনি সরকার।
ছোট ক্যাম্পাস, কম খরচ
সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী জমির চাহিদা কমানো হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ এড়ানো হবে।
নাজমুল ইসলাম জানান, ৫০ শয্যার একটি মেডিকেল কলেজের জন্য আদর্শভাবে ১৫ একর জমিই যথেষ্ট। অথচ আগে ৪০-৪১ একর পর্যন্ত জমি রাখার প্রস্তাব ছিল।
'ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের প্রয়োজন হলে আরও ৫ একর সংরক্ষণ করা যেতে পারে,' বলেন তিনি।
এছাড়া আগের পরিকল্পনায় প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপালের জন্য পৃথক বাংলোসহ প্রায় ৪২টি ভবনের নকশা ছিল।
নতুন পরিকল্পনায় এসবের পরিবর্তে বহুতল প্রশাসনিক ভবনের মাধ্যমে জায়গা ও নির্মাণ ব্যয় কমানো হবে। হাসপাতাল ও একাডেমিক ভবনেও ভার্টিক্যাল এক্সটেনশনের (ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ) সুযোগ রাখা হবে।
যেসব শহরে আগে থেকেই নার্সিং কলেজের সুবিধা রয়েছে, সেখানে নতুন করে নার্সিং কলেজ নির্মাণ না করারও পরিকল্পনা করছে সরকার। নাজমুল হাসান জানান, এর ফলে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের অব্যবহৃত খাস জমি ব্যবহার করা গেলে জমি অধিগ্রহণের ব্যয় আরও কমানো সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে নাজমুল হাসান বলেন, মাগুরায় বর্তমান হাসপাতাল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটি পরিত্যক্ত সরকারি টেক্সটাইল মিলের ২১ একরের বেশি জমি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত রয়েছে। ওই জমি ব্যবহার করা গেলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় এড়ানো সম্ভব হবে।
শিগগিরিই সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে ২০২২ সালের তুলনায় ইট, রডসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন ব্যয় হিসাবও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিক্ষক সংকট
সরকার মেডিকেলের মৌলিক বিষয়গুলোর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পুনরায় কাজে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজের ৬ হাজার ৪৪৬টি শিক্ষক পদের মধ্যে ২ হাজার ৭০০ পদই শূন্য। এই সংকট সবচেয়ে বেশি অধ্যাপক পর্যায়ে—এ পদের ৬৪.৬৫ শতাংশই ফাঁকা।
বিশেষ করে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মাকোলজি ও ফরেনসিক মেডিসিনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে এই সংকট অত্যন্ত তীব্র।
ডিজিএমইর মতে, এসব বিষয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় চিকিৎসকরা এগুলোর প্রতি আগ্রহী নন।
নাজমুল হাসান বলেন, যেসব শিক্ষার্থী মৌলিক বিষয়ে ভর্তি হবেন, সরকার তাদের প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বর্তমানে এসব বিষয়ে কর্মরত শিক্ষকদের মূল বেতনের ৭০ শতাংশের সমপরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হবে।
'এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যারা আছেন, তাদেরকে পুনরায় কাজে লাগানো হবে। এসব উদ্যোগের ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে আমদের মেডিকেল শিক্ষার মান আরো উন্নত হবে বলে আশা করছি,' বলেন তিনি।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের জন্য পরিকল্পনা
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর মেডিকেল কলেজটি স্থায়ী ক্যাম্পাসবিহীন কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালের ভবন ও ভাড়া করা ভবনে এ মেডিকেল কলেজের ক্লাস, ল্যাবরেটরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে।
এই কলেজ থেকে ইতিমধ্যে দুটি ব্যাচ এমবিবিএস সম্পন্ন করেছে এবং তৃতীয় ব্যাচের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ করতে হয় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন টিবিএসকে বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জমির মূল্য নির্ধারণ ও মূল্যায়নের কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে প্রকল্প পরিচালক ও হিসাবরক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের পাশাপাশি বেসিক বিষয়ের শিক্ষক সংকট কাটানো গেলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।
