পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস-ডিজিটাল জালিয়াতির সাজা ৫ বছরের জেল, সংসদে বিল পাস
ডিজিটাল উপায়ে পরীক্ষায় জালিয়াতি, সংঘবদ্ধভাবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ এবং নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে অনুমতি ছাড়া পরীক্ষার হলে প্রবেশের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রেখে 'পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬' জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিলটি উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
এই বিলের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ বছর আগে প্রণীত 'পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০' হালনাগাদ করা হয়েছে। নকল, প্রশ্নফাঁস, জাল সনদ এবং পাবলিক পরীক্ষায় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, বিশেষ করে পরীক্ষার তথ্যভান্ডারে হ্যাকিং, অননুমোদিতভাবে তথ্য পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা গোপন করার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আইনটি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার ডেটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং বা পরীক্ষার তথ্য বিকৃতিসহ ডিজিটাল জালিয়াতিতে জড়িত ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হবে।
আইনে সংঘবদ্ধ পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের জন্যও নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় লিখিত বা মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের অসাধু উপায়ে সহায়তা করা বা এমন সহায়তার প্রস্তাব দেওয়াও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে, এমনকি সংঘবদ্ধভাবে নকল বা অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নিলেও একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
এছাড়া পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন করে বৈধ অনুমতি ছাড়া পরীক্ষার হল বা কেন্দ্রে প্রবেশ কিংবা প্রবেশের চেষ্টা করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরীক্ষার সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করাকেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব অপরাধেও সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি বা কম নম্বর প্রদানকারী পরীক্ষকদের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেওয়া যাবে। তবে এ ধরনের অপরাধে দণ্ডাদেশ দেওয়ার আগে তৃতীয় একজন পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়নের অসংগতি নিশ্চিত করতে হবে।
আইনে পরীক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধে সহায়তা, যোগসাজশ বা ইচ্ছাকৃতভাবে অবদান রাখলে তাদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড, লাইসেন্স স্থগিত, কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বা কালো তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রাখা, আইনি দায়মুক্তি এবং প্রতিশোধমূলক হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। এ সুরক্ষা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, এই আইনের আওতায় কোনো শিশু অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে প্রাপ্তবয়স্কদের ফৌজদারি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে 'শিশু আইন, ২০১৩' অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সংশোধিত আইনের আওতাধীন সব অপরাধকে আমলযোগ্য করা হয়েছে। মহানগর এলাকায় মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহানগরের বাইরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এসব মামলার বিচার করবেন। বিচারকার্য ফৌজদারি কার্যবিধির সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
এছাড়া সংশোধিত আইনের বিধান বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
