নিলামে বেশি দামে বিক্রি, ২ বছরে চা খাতের আয় বেড়েছে ৫৬২ কোটি টাকা
সরকার নিলামে চায়ের সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পর গত দুই বছরে চা-বাগান মালিক ও ক্ষুদ্র চাষিরা অতিরিক্ত ৫৬০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছেন। এ সময়ে নিলামে চায়ের গড় দাম কেজিতে ৭৪ টাকার বেশি বেড়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ নিলাম বছরে চায়ের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা। ২০২৫-২৬ নিলাম বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সায়।
একই সময়ে নিলাম থেকে মোট আয় ১ হাজার ৬৬৪ কোটি ২১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ২২৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে আয় বেড়েছে প্রায় ৫৬২ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের মার্চে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকের পর ২০টি নিলামে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা প্রথম চালু করা হয়। ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর গত বছরের মে মাসে সরকার নীতিটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে দেশে চা খাতের শ্রমিক মজুরি, গ্যাস, সার, বিদ্যুৎ, কয়লাসহ সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। চা মোড়কজাতকারী কোম্পানিগুলোও ব্র্যান্ডিংসহ বিভিন্ন খরচ বৃদ্ধির কারণে প্যাকেটজাত চায়ের দাম বাড়িয়েছে। টানা কয়েক বছর ধরে চায়ের দরপতন হওয়ায় দেশের অনেক বাগানই ঋণ পরিশোধ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়া কিংবা নতুন করে উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে পারছে না।
চাষিদের সুরক্ষা দিতে সরকার সিলেট ও চট্টগ্রামের চায়ের নিলামে সর্বনিম্ন দাম প্রতি কেজি ২৪৫ টাকা নির্ধারণ করে, যা শিল্প খাতের আনুমানিক উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। উত্তরবঙ্গের বটলিফ চায়ের সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি কেজি ১৭০ টাকা।
চা বোর্ডের নিলাম তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৭ দশমিক ১৮৬ মিলিয়ন কেজি চা গড়ে প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা দরে বিক্রি হয়। এতে আয় হয় ১ হাজার ৬৬৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিক্রি কমে ৮৭ দশমিক ৭২২ মিলিয়ন কেজিতে নেমে এলেও বেশি দামের কারণে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকায়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিলামে বিক্রি সামান্য বেড়ে ৯০ দশমিক ৬৭২ মিলিয়ন কেজিতে দাঁড়ায়। একই সময়ে গড় দাম বেড়ে প্রতি কেজি ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সা হওয়ায় মোট আয় রেকর্ড ২ হাজার ২২৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
চা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এম এম ইস্পাহানী লিমিটেডের 'নেপচুন' চা-বাগানের ব্যবস্থাপক কাজী আরফান উল্লাহ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ন্যূনতম নিলাম মূল্য নির্ধারণের ফলে এবার চায়ের ভালো মূল্য পাওয়া গেছে। সংকটের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত চা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে চায়ের দাম বাড়লে চাহিদা কমে যায়। এই মৌসুমে চায়ের উৎপাদন ভালো হবে। যদি চা অবিক্রীত থাকে, তবে ওয়্যারহাউসের ব্যয়সহ অনেক ব্যয় বহন করতে হবে। এটি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা আছে।"
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ১৭২টি চা-বাগান রয়েছে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য দুই জেলায় ক্ষুদ্র পরিসরে চা চাষ হয়। সীমিত আকারে শুরু হলেও বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চল পঞ্চগড় জেলা।
২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত চায়ের ২১ শতাংশই হয়েছে উত্তরাঞ্চলের এ জেলায়। শীর্ষে থাকা মৌলভীবাজার জেলায় উৎপাদন হয়েছে ৪৭ শতাংশ চা। এ ছাড়া হবিগঞ্জে ১৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ১১ শতাংশ চা উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়—এই তিন নিলাম কেন্দ্র থেকে বিক্রি হয়।
একসময় পঞ্চগড়ের বাগানগুলোতে চা উত্তোলনে বিলম্ব হওয়ায় মান কমে যেত। ফলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদন করেও ক্ষুদ্র চা চাষিরা নিলামে কেজিপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা দরে চা বিক্রি করতেন। কিন্তু ন্যূনতম নিলাম মূল্য নির্ধারণের ফলে সর্বশেষ নিলাম বছরে কেজিপ্রতি চা ২৪১ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে ২৪৬ টাকা ৬৩ পয়সা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়েছে।
শনিবার শ্রীমঙ্গলে ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে বিষয়গুলো আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে উৎপাদন, মানোন্নয়ন, রপ্তানি ও শ্রমিক কল্যাণে অবদানের জন্য শীর্ষস্থানীয় চা-বাগান, রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র চাষিদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
