চিকিৎসকের মৃত্যু: স্বামী-শ্বশুরসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে সিআইডি
রাজধানীর ধানমন্ডিতে ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা নামের এক নারী চিকিৎসকের অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে নিহতের স্বামী, শ্বশুরসহ চারজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে মামলা দায়েরের আবেদন করেন নিহতের স্বজন ও বাদী মো. মশিউর রহমান শাহ। এ সময় আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে বিষয়টি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
পরে বিকেলে আদালত মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।
মামলার আসামিরা হলেন— নিহতের শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা, স্বামী ডা. রহমত রশীদ, শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ (বারডেম হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান) এবং ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম 'ইয়ার্কি'র সম্পাদক সিমক নাসের।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, পড়াশোনার সময় ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার সঙ্গে সহপাঠী ডা. রহমত রশীদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তারা বিয়ে করেন। তাদের সংসারে বর্তমানে দুই বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ডা. ধীপ্রা অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল পরিবার থেকে আসায় বিয়ের পর থেকেই আসামিরা তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন। ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। সন্তান প্রসবের পর তিনি পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আসামিরা নিজেরা চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও ডা. ধীপ্রার চিকিৎসার খরচ না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন। এমনকি তার এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেও তারা অন্যায়ভাবে বাধা দেন।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে ডা. ধীপ্রা 'Female Doctors in Bangladesh' নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে তার ওপর হওয়া পারিবারিক নির্যাতনের কথা পোস্ট করেছিলেন বলেও মামলার আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বাদী আরও বলেন, গত ২ জুন থেকে টানা তিন দিন আসামিরা ডা. ধীপ্রাকে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এ সময় তাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি এবং দুই বছরের সন্তানকেও দেখতে দেওয়া হয়নি।
গত ৪ জুন খবর পেয়ে ডা. ধীপ্রার মা ধানমন্ডির 'বসতী গ্রীন' আবাসন এলাকার ৪/এ রোডের ৪৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। সেখানে মেয়েকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখে তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করলে তার স্বামী তালা খুলে দেন।
অভিযোগে বলা হয়, ঘর থেকে বের হয়েই ডা. ধীপ্রা তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, "মা, আমি ভাত খাব।" এ কথা বলার পরপরই তিনি ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
মামলার আবেদনে আরও দাবি করা হয়, ডা. ধীপ্রা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। বরং আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করেন।
পরে শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদের প্রভাব বলয় ব্যবহার করে চিকিৎসার নামে দূরবর্তী বারডেম হাসপাতালে নেওয়ার পথে ডা. ধীপ্রার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, মৃত্যুর পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে একটি মিথ্যা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করান এবং দ্রুত দাফন সম্পন্ন করেন।
বাদীর অভিযোগ, এটি ডা. ধীপ্রার স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আলামত ধ্বংসের চেষ্টা।
