এলডিসি উত্তরণের পর সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের ঝুঁকি: বাণিজ্যমন্ত্রী
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশ প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ তথ্য জানান।
১৩তম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশ শিগগিরই এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ ঘটাবে। এর ফলে উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্কিমের অধীনে বর্তমানে যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তা আর থাকবে না। এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বাণিজ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।'
এদিকে, রপ্তানি আয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির পথে হাঁটছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পন্ন হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে 'কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট' (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে।
এ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ বেশ কিছু দেশের সঙ্গে এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) বা সিইপিএ সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে নতুন বাজার খোঁজার কাজ চলছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির জন্য পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট যেমন—জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটকেও দায়ী করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেল, খাদ্য ও শিল্প কাঁচামালের উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। আলোচ্য সময়ে ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির বিপরীতে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২০২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করলেও মোট আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একক খাতের ওপর এই নির্ভরতা কমাতে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, আইসিটি ও সফটওয়্যার, হালকা প্রকৌশল, হিমায়িত খাদ্য এবং প্লাস্টিক পণ্য—এই আটটি সম্ভাবনাময় খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এসব খাতের আংশিক রপ্তানিকারকদেরও ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭ প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের জন্য 'কাগজ ও প্যাকেজিং' পণ্যকে 'প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার' ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া রপ্তানিকারকদের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রাক-জাহাজীকরণ ঋণ তহবিল এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে ঋণ সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আলিমের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২০ সালে ভুটানের সঙ্গে পিটিএ সই হওয়ার ফলে ১০০টি বাংলাদেশি পণ্য সেখানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তির আলোচনা চলছে। ভারতের সঙ্গে 'সেপা' সইয়ের আলোচনাও অগ্রাধিকারে রয়েছে।
তবে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আফগানিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
