সারাদেশে অবিক্রীত রয়ে গেছে ২২ লাখের বেশি কোরবানির পশু
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে আসা আব্দুস সাত্তার গাবতলী পশুর হাটে ৩৮টি গরু বিক্রির জন্য এনেছিলেন। এর মধ্যে ১৬টি বিক্রি হয়নি। ঈদের দিন সকালে হাটে কথা হয় তার সঙ্গে, এ সময় তিনি অবিক্রীত গরু ফেরত নেওয়ার জন্য ট্রাক খুঁজছিলেন।
এ বছর কোরবানির পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় ঈদের আগের রাত থেকেই পশুর দাম কমতে শুরু করে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে ১ কোটির কিছু বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। সে হিসাবে ২২ থেকে ২৩ লাখ পশু অবিক্রীত থেকে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এবার প্রায় এক কোটি পশু কোরবানি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনো প্রস্তুত হয়নি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, "কত পশু কোরবানি হয়েছে, তার হিসাব আমরা করছি। এখনো অনেকে পশু কোরবানি দিচ্ছেন। ঈদের ছুটি শেষে অফিস খুললে আমরা হিসাব চূড়ান্ত করে সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি তুলে ধরব।"
ঈদের আগের দিন গাবতলী হাটে সাভারের জাহান এগ্রো ফার্মের ৯টি গরুর মধ্যে মাত্র একটি বিক্রি হয়েছিল। ফার্মটির স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জুলকার নাঈন হোসেন বলেন, "আমাদের ফার্মের গরুগুলো ২৬ তারিখ হাটে তুলেছিলাম। মাত্র একটি গরু বিক্রি হয়েছে, বাকি গরুগুলো ফার্মে ফিরিয়ে এনেছি।"
তিনি জানান, কিছু গরু লোকসানে বিক্রি করতে হয়েছে। হাট থেকে ফিরিয়ে আনার খরচ এড়াতে একটি গরু কম দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
ঈদের দিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত গাবতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, একের পর এক ট্রাকে অবিক্রীত গরু তুলে নিয়ে যাচ্ছেন বিক্রেতারা। কেউ আবার ট্রাক না পেয়ে হাটজুড়ে পরিবহনের খোঁজ করছেন।
মানিকগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লাভলু বলেন, "৪৪টি গরু এনেছিলাম। বিক্রি করতে পেরেছি মাত্র ১৩টি। বাকি গরু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এবার আমরা গরুর সঙ্গে নিজেরাও কোরবানি হয়ে গেছি।"
আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি ৩৮টি গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। এর মধ্যে ১৬টি বিক্রি হয়নি।
তিনি বলেন, "ঈদের দুই দিন আগে যে গরুর দাম ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলা হয়েছিল, আজ সেটি ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। ঋণ করে গরু কিনেছি, টাকা পরিশোধ করতে হবে বলেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।"
খামারি ও ব্যাপারীরা বলছেন, কয়েক দিনের বৃষ্টি ও কাদার কারণে হাটে গরু রাখলে সেগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। তাই অনেকেই বড় ধরনের লোকসান মেনে গরু বিক্রি করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রতি গরুতে এক লাখ টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।
খামারিদের ভাষ্য, কোরবানিকে কেন্দ্র করে ৬ থেকে ৮ মাস আগে থেকেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসে। পরে সেগুলো বিভিন্ন খামারে লালন-পালন করে কোরবানির বাজারে ছাড়া হয়। ফলে বাজারে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
গত তিন দিনে বিভিন্ন পশুর হাটে প্রায় ১০০ জন ব্যবসায়ী, খামারি ও ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্বল বিক্রি এবং পরবর্তীতে গাবতলী হাটে পশুর দাম ধসে পড়ার পেছনে অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত—দুই ধরনের কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পরিবার কোরবানির বাজেট কমিয়েছে, ছোট আকারের পশু কিনেছে অথবা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কোরবানি দিয়েছে।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মালিক মোহাম্মদ ওমর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "খামারিরা এবার কোরবানিতে যে পরিমাণ পশু বিক্রির জন্য বাজারে তুলেছেন, তার প্রায় ২০ শতাংশ অবিক্রীত রয়েছে।"
তিনি বলেন, "২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে কোরবানির আগ পর্যন্ত গোখাদ্যের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু খামারিরা গত বছরের দামে গরু বিক্রি করেছেন। ঈদের দুই-এক দিন আগে দাম আরও কমে যায়। এমনকি রমজানে যে দামে খামারিরা গরু বিক্রি করেছেন, সেই দামেও কোরবানির জন্য গরু বিক্রি করতে পারেননি।"
৫৬ লাখের বেশি কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ
এ বছর ৫৬ লাখের বেশি কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
গতকাল সিলেটে আয়োজিত এক আলোচনা সভা শেষে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনেও আরও কিছু চামড়া সংরক্ষণ হবে বলে সরকার আশা করছে।
মন্ত্রী বলেন, পরবর্তী ধাপে চামড়া ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয় কার্যক্রম ধীরগতির হলে সরকার 'ওয়েট ব্লু' চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেবে।
বর্তমান সংরক্ষণ পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভোগারও আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষ্য, অনিশ্চয়তার মধ্যেও এ অর্জন এসেছে।
তিনি বলেন, "কঠিন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে এর চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।"
চামড়া শিল্পকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভাগীয় শহরগুলোতে আধুনিক কসাইখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব স্থাপনায় পেশাদার পদ্ধতিতে পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হবে। পরে কম খরচে ভোক্তাদের কাছে মাংস পৌঁছে দেওয়া হবে।
তার মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে কসাইখানাগুলোতে সংগৃহীত সব চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে পশু জবাইজনিত বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণও কমবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর যেসব সক্ষম ট্যানারি মালিক উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে পারেননি, সরকার তাদের সহায়তা করবে। বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনে তাদের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি জানান, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের সক্ষমতাও বাড়ানো হবে।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, "আমরা চাই সাভারে পরিচালিত প্রতিটি ট্যানারি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) গোল্ড সনদ অর্জন করুক। ভবিষ্যতে এটাই হবে সরকারের নির্ধারিত মানদণ্ড।"
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই টেকসই মানদণ্ড অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি মূল্য বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিকারকেরা যেন সর্বোচ্চ মূল্য পান, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।
