বাজেট সহায়তায় ঘাটতির শঙ্কা, প্রকল্প ঋণ পুনর্বিন্যাসে ঝুঁকছে সরকার
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অন্তত ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া মিলছে না।
এ পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের এমন ঋণ, যা এখনই ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই, তা জরুরি প্রয়োজনে পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বাজেট সহায়তার তুলনায় আরও বেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব অর্থ জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যবহার করা যাবে।
গত ১২ এপ্রিল অর্থ বিভাগ থেকে ইআরডিকে পাঠানো এক চিঠিতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। তবে এখন পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১ দশমিক ৬৬৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তার নিশ্চয়তা পেয়েছে সরকার।
এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাপান থেকে ৩১৫ মিলিয়ন ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশ্বাস মিলেছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পুনর্বিন্যাসের কাজও করছে সরকার। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং পুনর্বিন্যাসের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও ধীরগতির প্রকল্পগুলো পুনর্বিন্যাসের জন্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
পুনর্বিন্যাস করা অর্থ জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে স্বল্পমেয়াদি, এক বছর মেয়াদি কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। এতে তাৎক্ষণিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের গতি বাড়বে এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
চলতি অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা দিচ্ছে এডিবি
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। সরকারও সংস্থাটির কাছে একই পরিমাণ সহায়তা চেয়েছিল।
ইআরডি সূত্র জানায়, সোমবার এডিবির প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে দুটি বাজেট সহায়তা চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
এর মধ্যে 'সেকেন্ড স্ট্রেনদেনিং সোশ্যাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম (সাবপ্রোগ্রাম-২)' শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেবে এডিবি।
এ ছাড়া 'স্ট্রেনদেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, সাবপ্রোগ্রাম-২' শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় আরও ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ চুক্তি সই হবে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন ও অর্থছাড় স্থবির থাকা প্রকল্পগুলো থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার পুনর্বিন্যাস করা হবে।
বাজেট সহায়তার বদলে ঋণ পুনর্বিন্যাসে জোর দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
বৈদেশিক অর্থায়নের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশকে নতুন বাজেট সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে ঋণ পুনর্বিন্যাসে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।
ইআরডি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয়। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
ইআরডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক থেকে নতুন বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাইপলাইনে থাকা বিশ্বব্যাংকের অব্যবহৃত ঋণ পুনর্বিন্যাস করে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ও আর্থিক অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জরুরি সংকট মোকাবিলায় মোট ১ দশমিক ৮৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল ছাড়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে।
ইআরডি সূত্র জানায়, র্যাপিড রেসপন্স অপশন (আরআরও)-কন্টিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স (সিইআরপি) তহবিলের জন্য ইতোমধ্যে আটটি প্রকল্প থেকে অর্থ পুনর্বিন্যাস করে ৭৮৫ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে।
এর মধ্যে গ্যাস সেক্টর এফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড কার্বন অ্যাবেটমেন্ট প্রকল্প থেকে ২৩৯ মিলিয়ন ডলার, যমুনা রিভার সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট-১ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার, লার্নিং অ্যাকসেলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন অপারেশন থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট থেকে ১৫ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট থেকে ৯৫ মিলিয়ন ডলার, চট্টগ্রাম ওয়াটার সাপ্লাই ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট থেকে ১৪০ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ রিজিওনাল ওয়াটারওয়ে ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট-১ থেকে ৭৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট থেকে ১৩৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার সরানো হয়েছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, সরকার কন্টিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রজেক্ট (সিইআরপি) পদ্ধতির মাধ্যমে এই অর্থ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আওতায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধসহ জরুরি আমদানি ব্যয় মেটানো হবে।
সিইআরপি সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং প্রতিটি কার্যক্রমের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। এ লক্ষ্যে ইআরডি বিদ্যমান অর্থায়ন চুক্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনবে এবং অর্থ বিভাগ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো প্রস্তুত করবে।
বিশ্বব্যাংকের কন্টিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রজেক্ট (সিইআরপি) হলো একটি বিশেষ জরুরি অর্থায়ন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো দেশে আকস্মিক সংকট দেখা দিলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ দ্রুত অন্য খাতে ব্যবহার করা যায়। এ ব্যবস্থায় নতুন করে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রকল্প অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। বরং বিদ্যমান প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করে তা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।
এদিকে প্রথমবারের মতো ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং (আইপিএফ) গ্রহণ করছে সরকার। এটি আগে অনুমোদিত আরআরও-সিইআরপি তহবিলের মতোই দ্রুত ও সহজ নিয়মে ব্যয় করা যাবে। এই অর্থ মূলত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করা হবে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ২৫০ মিলিয়ন ডলারের এই জরুরি বিনিয়োগ অর্থায়ন প্রকল্প কোনো নতুন ঋণ নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান যেসব প্রকল্প শেষ হতে যাচ্ছে, সেগুলোর অব্যবহৃত বা বাতিল হওয়া অর্থ একীভূত করে এই নতুন জরুরি তহবিল গঠন করা হয়েছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই অর্থ জরুরি ভিত্তিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় এবং সংকটকালীন অতিরিক্ত অন্যান্য ব্যয় মেটাতে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে।
এআইআইবির কাছে প্রত্যাশা ছিল ৭৫০ মিলিয়ন, মিলছে ২৫০ মিলিয়ন
ইআরডি সূত্র জানায়, সরকার এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চেয়েছিল। তবে সংস্থাটি 'স্ট্রেনদেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, সাবপ্রোগ্রাম-২' শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া এআইআইবির অর্থায়নে চলমান একটি প্রকল্প থেকে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলার পুনর্বিন্যাস করা হবে। এই অর্থ 'সিলেট-তামাবিল সড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ' প্রকল্প থেকে সরানো হবে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পটির অর্থছাড় দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এ কারণে প্রকল্পটির ঋণ পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
৫০০ মিলিয়নের জায়গায় ৩১৫ মিলিয়ন দিচ্ছে জাপান
চলতি অর্থবছরে উচ্চ সুদে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দিতে সম্মতি দিয়েছিল জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। তবে পরে তা কমিয়ে ৩১৫ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইআরডি।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশ অনুযায়ী এ ঋণ ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে জরুরি আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা।
তবে ফ্রান্সের কাছে ২০০ মিলিয়ন ডলার এবং জার্মান সরকারি সংস্থার কাছে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চাওয়া হলেও এখনো এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানান তারা।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ দশমিক ৭৬৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ দশমিক ৫৯৭ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছিল।
