সরকারের নীতি ও শাসনব্যবস্থায় গণমাধ্যমের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে: ইফতেখারুজ্জামান
সরকারের নীতি ও শাসনব্যবস্থায় গণমাধ্যমের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ''রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এমন একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।''
রবিবার (৩ মে) রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত 'রিবিল্ডিং পাবলিক ট্রাস্ট: মিডিয়া ইনডিপেন্ডেন্স অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক অ্যাকাউন্টিবিলিটি ইন বাংলাদেশ'- শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। যৌথভাবে সভার আয়োজক ইউনেস্কো ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ''রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে গণমাধ্যম সত্যিকারের স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।''
তিনি বলেন, ''কেবল আত্মনিয়ন্ত্রণ [সেলফ-রেগুলেশন] দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না রাজনৈতিক ও শাসন কাঠামোর ভেতরে সহায়ক পরিবেশ থাকে।''
তিনি আরও বলেন, ''অনেক সময় সেলফ-রেগুলেশনকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।''
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ''ডিজিটাল স্পেস নিয়ন্ত্রণে যেসব আইন বা অধ্যাদেশ আনা হচ্ছে, সেগুলো সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে উৎসাহিত করছে কি না—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।''
রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং মিডিয়ার ভেতরে বিভাজন তৈরি হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে ইউনেস্কোর দপ্তর প্রধান ও প্রতিনিধি সুজান ভাইজ বলেন, ''মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইউনেস্কোর ম্যান্ডেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস এর গুরুত্বকে বিশ্বব্যাপী স্মরণ করিয়ে দেয়।''
তিনি বলেন, ''ইউনেস্কো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক প্রয়োজনীয়তা এবং এর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান হুমকি উভয় বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে। সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের কর্মপরিকল্পনার প্রধান সংস্থা হিসেবে ইউনেস্কো গণমাধ্যম উন্নয়নের সূচকও তৈরি করে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রবণতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।'
সুজান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ''সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকির শিকার হচ্ছে।''
তিনি বলেন, ''এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়—এটি একটি বৈশ্বিক ঘটনা।''
তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়ন, আক্রমণ এবং কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যা তাদের কাজকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সুজান এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্য।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি ভিত্তিপ্রস্তর।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, এখানে গণতান্ত্রিক চর্চা থাকলেও, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অবস্থা উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ''গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ হতাশাজনক।''
তার মতে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি মুক্ত গণমাধ্যম পরিবেশ অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ''স্বচ্ছতা কোনো হুমকি নয়; এটি একটি স্বাধীন সমাজের ভিত্তি।''
সরকার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য পক্ষের খোলামেলা সমালোচনা প্রতিষ্ঠান ও জনআস্থাকে শক্তিশালী করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
লটজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরে বলেন, ''ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের সহজলভ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।''
সভায় দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ''দেশে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে পৌঁছেছে। এর পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করেছে-একদিকে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের নিয়ন্ত্রণ ও ভীতি, অন্যদিকে মালিকানা ও করপোরেট স্বার্থের প্রভাব।''
তিনি বলেন, ''অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের প্রভাবের কারণে সম্পাদকরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন- অর্থ পাচার বা ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু গণমাধ্যম নিজেদের মালিকদের নাম বাদ দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে, যা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।''
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) এক্সিকিউটিভ এডিটর শাখাওয়াত লিটন বলেন, ''বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার একটি বড় সমস্যা হলো 'পোস্টমর্টেম জার্নালিজম'। অর্থাৎ, সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সমালোচনা করা যায় না বা করা হয় না; কিন্তু সরকার পতনের পর তার ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হয়।'
তিনি বলেন, ''ফ্রি প্রেস অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১–২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যার তথ্য দিয়েছে গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক।''
তিনি আরও বলেন, ''ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও স্বাধীন গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।''
জোসেফ স্টিগলিৎসসহ অর্থনীতিবিদদের গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ''শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য।''
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ''বর্তমান সরকারকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা যাচ্ছে, এটি একটি ইতিবাচক দিক। সরকারকে উচ্চস্বরে সমালোচনা করা যাচ্ছে, আমরা চাই এটি অব্যাহত থাকুক।"
তিনি বলেন, ''আপনারা প্রত্যেকে খুব স্ট্রংলি সরকারের যেকোনো ধরনের সমালোচনা, যৌক্তিক সমালোচনা কন্টিনিউ করবেন…এই দেশে একটা দুর্দান্ত ভাইব্রেন্ট মিডিয়া আবার তৈরি হবে, এটা আমি দেখতে চাই।''
তথ্য উপদেষ্টা মনে করেন, ''গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গণমাধ্যমের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো বোকামি। এ কারণে বর্তমান সরকার এমন কিছু করতে চায় না, যা গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে।''
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ''দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য যেসব পদক্ষেপ আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।''
আলোচনা সভায় ৫ আগস্টের পর আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, নোয়াবের (নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এই বিষয় উঠে আসে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস (৩ মে) উপলক্ষে ৩০ এপ্রিল আরএসএফ প্রকাশিত ২০২৬ সালের 'ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স' বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম স্থানে নেমে গেছে বাংলাদেশ।
এ বিষয় উত্তরণের বিষয়ে কথা বলেন যমুনা টিভির সিইও ফাহিম আহমেদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি প্রমুখ। আলোচনা সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
