বকেয়া ভর্তুকির টাকা না দিলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ মিলবে না পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে
রমজান, আসন্ন গ্রীষ্মকাল এবং সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশের বড় দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ৪ হাজার ৭২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বকেয়া ভর্তুকি না পাওয়ায় কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকটে পড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক চিঠিতে সতর্ক করে বলেছে, বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করা না হলে দেশের বৃহত্তম দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র—রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না। এই দুটি কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট 'বেস-লোড' বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গত বছরের আগস্ট মাস থেকে এই কেন্দ্র দুটির ভর্তুকি পেমেন্ট বকেয়া রয়েছে।
অর্থসচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারকে দেওয়া চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, দ্রুত বকেয়া অর্থ ছাড় করা না হলে রমজান, সেচ মৌসুম ও গরমের সময় বাড়তি চাহিদার বিপরীতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
'এতে সারাদেশে ২০০০-২৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এর ফলে একদিকে সেচ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হবে, অন্যদিকে লোডশেডিংজনিত কারণে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে', বলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া এবং বাংলাদেশের প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার তাদের প্ল্যান্ট বন্ধ রাখার ঘোষণার প্রেক্ষাপটে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই নতুন সংকট তৈরি হলো।
আটকে আছে ভর্তুকির অর্থ
চলমান রমজান, সেচ মৌসুম ও আসন্ন গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) আগের নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত বকেয়া ভর্তুকি ছাড় করার জন্য অর্থসচিবকে অনুরোধ জানিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল ও ১,৩২০ মেগাওয়াটের পায়রা কেন্দ্রের ভর্তুকি পেমেন্ট গত আগস্ট থেকে স্থগিত রয়েছে। মূলত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে বিদ্যুৎ বিক্রির দাম বা ট্যারিফ রেট অনুমোদিত না হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
যদিও সরকার কোম্পানি দুটির সাথে ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করেছে, কিন্তু বিদেশি ঋণদাতাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় বিপিডিবি প্রস্তাবটি ক্রয় কমিটির সামনে উপস্থাপন করতে পারছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সোলায়মান স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরও বলা হয়, রমজান ও গ্রীষ্মের এই সংকটকালে কেন্দ্রগুলোকে সময়মতো অর্থ প্রদান করা অপরিহার্য।
বিপিডিবি-র তথ্য অনুযায়ী, রামপাল ও পায়রা কেন্দ্রের জন্য প্রতি মাসে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এই দুটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিলও সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, 'বিদ্যুৎ কেন্দ্রদ্বয়ের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ বিদ্যমান থাকায় ট্যারিফ সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ঋণদাতাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করা আবশ্যক। অদ্যাবধি ছাড়পত্র না পাওয়ায় সংশোধিত ট্যারিফ রেট অনুমোদনের জন্য ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি।'
'তবে বিষয়টি নিয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েূছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ট্যারিফ রিভিউ সম্পন্ন করে সংশোধিত প্রস্তাব ক্রয় কমিটিতে পাঠানো হবে', বলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
