দৃঢ় অবস্থান গড়তে এখনই আদানি চুক্তি বাতিলের পরামর্শ আইনজীবী দলের
বিদেশি আইনি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারকে বিতর্কিত আদানি পাওয়ার চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের সতর্কবার্তা—বিষয়টি নিয়ে আরও দেরি করলে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (এসআইএসি)-এ সম্ভাব্য সালিশি মামলায় বাংলাদেশের অবস্থান গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র ও জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি)-এর একাধিক সদস্য দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান যে, কমিটির সংগ্রহ করা প্রমাণ পর্যালোচনার পর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই এই পরামর্শ দেন জ্যেষ্ঠ বিদেশি আইনজীবীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কিংস কাউন্সেল ফারহাজ খানও।
আলোচনায় যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, মূল উদ্বেগের জায়গা হলো—দুর্নীতি ও জালিয়াতির প্রকাশ্য অভিযোগ থাকার পরও দীর্ঘ সময় কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে— যদি এই বিরোধ শেষপর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে গড়ায়।
বিলম্ব মানেই চুক্তি মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, ইংরেজ আইন অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়াকে চুক্তির নীরব স্বীকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "কোনো পক্ষ যদি ঘুষ বা জালিয়াতির শক্ত প্রমাণ থাকার দাবি করেও দীর্ঘসময় চুক্তি কার্যকর রাখতে থাকে এবং পরে আইনি প্রতিকার চায়, তাহলে সালিশকারীরা এটিকে স্ববিরোধী আচরণ হিসেবে দেখাতে পারেন। এতে মনে হতে পারে, সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেই তার প্রমাণ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল না।"
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও এনআরসি সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, চুক্তি প্রক্রিয়ায় প্রতারণামূলক আচরণ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত উপাদান কমিটি ইতোমধ্যেই সংগ্রহ করেছে।
তিনি বলেন, "আদানি চুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের কাছে জালিয়াতি তদন্ত শুরুর মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই আইনি বিশেষজ্ঞরা সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন।"
সরকার পরিবর্তনের পর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎখাতের বড় চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি) গঠন করা হয়, যার মধ্যে আদানি চুক্তি নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা আছে।
আইনি পরামর্শ গোপনীয়
এনআরসি সদস্যরা জানান, ফারহাজ খানসহ বিদেশি আইনজীবীদের বিস্তারিত মতামত 'লিগ্যাল প্রফেশনাল প্রিভিলেজ'-এর আওতায় সুরক্ষিত।
এনআরসির একজন সদস্য বলেন, "কিংস কাউন্সেলের পরামর্শ সরকারকে দেওয়া হয়েছে, এটি জনসমক্ষে প্রকাশের বিষয় নয়।"
ইংরেজ আইনে আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যে গোপন যোগাযোগকে প্রকাশের বাইরে রাখার বিধান রয়েছে, যাতে খোলামেলা আইনি পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হয়। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরামর্শের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট— (আদানি চুক্তি বাতিলে) দুর্নীতিকে যদি মূল যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে হয়, তাহলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিদ্যুৎ নেওয়া চললে 'এস্টপেল'-এর ঝুঁকি
কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরার পাশাপাশি আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ 'এস্টপেল' ডকট্রিনের মুখে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, "প্রকাশ্যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আবার বিদ্যুৎ নেওয়া চালিয়ে গেলে মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়। আদানির আইনজীবীরা বলতে পারেন—বাংলাদেশ তার আচরণের মাধ্যমে চুক্তি মেনে নিয়েছে।"
'জুডিশিয়াল এস্টপেল' ডকট্রিন বা নীতির অর্থ হলো, কোনো পক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিতে পারে না। বাস্তবে এর অর্থ হলো—চুক্তি বাস্তবায়ন চলতে থাকলে পরে সেটিকে দুর্নীতির কারণে বাতিলের দাবি করার সুযোগ হারাতে পারে বাংলাদেশ।
এনআরসির একজন সদস্য বলেন, আইনি লড়াইয়ে "সালিশকারীদের স্বাভাবিক প্রশ্ন হবে—চুক্তি যদি এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ আগে কেন আপত্তি তোলে নাই?"
'শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য'—তবে শর্ত সাপেক্ষে
আইনি পরামর্শকেরা ইংরেজ আইনের 'ভয়েড অ্যাব ইনিশিও' নীতির কথাও তুলে ধরেছেন, যার অর্থ—দুর্নীতিতে কলুষিত চুক্তি শুরু থেকেই অবৈধ।
অধ্যাপক মোশতাক বলেন, "যদি কোনো চুক্তি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য। কিন্তু কোনো পক্ষ যদি দুর্নীতির কথা জেনেও চুক্তি চালিয়ে যায়, তাহলে সেটিকে চুক্তি বহাল রাখার সম্মতি হিসেবে ধরা হতে পারে।"
তিনি বলেন, প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সঠিক আইনি পথ হলো চুক্তি বাতিল করা। এরপর আদানি চ্যালেঞ্জ জানালে বিষয়টি সালিশে যাবে।
@প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কথিত অর্থ লেনদেনের গতিপথ
তদন্তের অংশ হিসেবে এনআরসি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে সমন্বয় করে চুক্তি আলোচনায় ও অনুমোদনে যুক্ত থাকা বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
কমিটির তথ্যমতে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ইতোমধ্যে দেশ ছেড়েছেন। যারা দেশে আছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
এনআরসির এক সদস্য বলেন, "তারা সব প্রাসঙ্গিক নথিপত্র দেওয়ার এবং তদন্তে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।"
অধ্যাপক মোশতাক জানান, কমিটি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং আরও কাগজপত্র সামনে আসছে।
তিনি বলেন, "আমরা আইনি বিশেষজ্ঞ, হুইসেলব্লোয়ার ও বেসরকারি তদন্তকারীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তাদের সবাই নিশ্চিত করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগে দেওয়ানি মামলা করার মতো যথেষ্ট উপাদান আমাদের হাতে রয়েছে। এসব তথ্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা পর্যালোচনা করেছেন এবং পরে কিংস কাউন্সেল তা বৈধতা দিয়েছেন।"
এনআরসির অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে, চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে অনুমোদন দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে যান এবং পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ বিদেশে কোম্পানি খোলেন, যেখানে আদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা অর্থ জমা হয়।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, আদানির সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৫ সালের দিকে, আর ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত হয়। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদনের পর কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের অভিযোগ রয়েছে।
বিতর্কিত একটি চুক্তি
২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেডের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় ২০২৩ সালে।
শুরু থেকেই চুক্তির মূল্য কাঠামো, কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের অভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও এনআরসি সদস্যদের মতে, তুলনামূলক অন্যান্য কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের চেয়ে বাংলাদেশ এখানে বিদ্যুতের চড়া দর দিচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ মূল্যে চাপ বাড়াচ্ছে।
এরপর কী
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পরবর্তী সরকার যদি আইনি পরামর্শ অনুযায়ী চুক্তি বাতিল করে, তাহলে আদানি আপত্তি জানালে বাংলাদেশ সালিশি প্রক্রিয়ায় যাবে।
অধ্যাপক মোশতাক হোসেন বলেন, "চুক্তি বাতিলের পরই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিশ প্রক্রিয়া শুরু করব।"
কর্মকর্তারা সময়ের গুরুত্বের কথা জোর দিয়ে বলেছেন।
একজন এনআরসি সদস্য বলেন, "যত দেরি হবে, আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি তত বাড়বে। সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।"
আদানির প্রতিক্রিয়া
ফাইভডব্লিউ কমিউনিকেশনসের মাধ্যমে ই-মেইলে পাঠানো প্রতিক্রিয়ায় আদানি পাওয়ার জানায়, এ ধরনের কোনো আইনি পরামর্শের বিষয়ে তারা অবগত নয়; বিপিডিবির পক্ষ থেকেও তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
কোম্পানিটি জানায়, "বাংলাদেশ সরকারের আইনজীবীরা কী পরামর্শ দিয়েছেন—এ বিষয়ে মন্তব্য করার অবস্থানে আদানি পাওয়ার নেই।" তারা আরও বলে, বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়বদ্ধতা তারা অব্যাহতভাবে পালন করবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা গুরুত্ব দেয় উল্লেখ করে আদানি পাওয়ার নিজদের "নির্ভরযোগ্য জ্বালানি অংশীদার" হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অন্যান্য আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক উৎপাদকরা বকেয়া পরিশোধে বিলম্বের সময় যখন উৎপাদন কমায় তখনও আদানি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রেখেছে।
"এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব জোরদারে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন," বিবৃতিতে বলা হয়।
