ট্রাম্পের ১৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা: রপ্তানিকারকদের স্বস্তি মিললেও কাটেনি অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। তবে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অবশ্য এই শুল্ক এখনও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তিতে নির্ধারিত ১৯ শতাংশের চেয়ে কম।
তবে শিল্প নেতা ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, শুল্ক কমায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ঘন ঘন শুল্ক হার পরিবর্তনের কারণে সর্ববৃহৎ রপ্তানি বাজারটি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার ঘোষিত রায়ের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর ছিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে ১৯ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা। তবে চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি।
রায়ের পর ট্রাম্প সব দেশের ওপর প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরে সেটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এই শুল্ক কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা গত বছরের এপ্রিলের আগে যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুল্ক কমায় যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা আগের চেয়ে কম খরচে পোশাক আমদানি করতে পারবেন। এতে দেশটির খুচরা বাজারে তৈরি পোশাকের দাম কমবে। ফলে ভোক্তারা আগের চেয়ে বেশি পোশাক কিনতে পারবেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তারা এ আশঙ্কাও করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেও এটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ অনুমান করতে পারছেন না। এ কারণে ক্রেতারা বড় ও দীর্ঘমেয়াদী অর্ডার এড়িয়ে ঝুঁকি কমাতে ছোট চালান বেছে নিতে পারেন।
রয়েছে অনিশ্চয়তাও
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিও কার্যকরভাবে বাতিল হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুক্তিতে সই করা দেশগুলোকে এ চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্পের ভাষায়, আদালত কেবল আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীন তার ক্ষমতা সীমিত করেছে। তাই বাণিজ্য ও শুল্ক নীতিতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের হাতে আরও অনেক পথ খোলা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করা ভারত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশকে পাল্টা শুল্কের বদলে ১০ শতাংশ শুল্ক (এখন ১৫ শতাংশ) দিতে হবে উল্লেখ করলেও স্বাক্ষরিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেগুলো মেনে চলতে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দেশগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা শুল্ক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা বোঝার জন্য আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, এখন আবেগ নয়, কৌশল জরুরি। বাংলাদেশের উচিত ১৫০ দিনের 'উইন্ডো'কে কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য অভিযোগের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা, শ্রমমান, পরিবেশমান ও বাণিজ্য স্বচ্ছতার বিষয়ে প্রস্তুতি শক্তিশালী করা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে বিকল্প কৌশল তৈরি করা এবং নতুন বাস্তবতায় পুনঃআলোচনার প্রস্তুতি রাখা।
বিষয়টি একদিকে যেমন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে ঝুঁকিও তৈরি করছে বলে বর্ণনা করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেছেন, যদি পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়, তাহলে চুক্তির আইনি বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ আগের কিছু প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারে — তবে সেটা সম্ভব হবে যদি চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ধারা (এক্সিট ক্লজ) ও আগাম নোটিশ দেওয়ার নিয়ম এতে অনুমতি দেয়।
তিনি সতর্ক করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবার জন্য একই ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারে, নতুন অশুল্ক বাধা দিতে পারে, কোটার সীমা নির্ধারণ করতে পারে বা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।
তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে পুরো চুক্তি থেকে সরে যাওয়া কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে'। তাই তিনি বর্তমান প্রতিশ্রুতিগুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করার এবং সম্ভাব্য বিকল্প বাণিজ্য সীমাবদ্ধতার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডাব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান ও র্যাপিড-এর চেয়ারম্যান এমএ রাজ্জাক মনে করেন, চুক্তিটি এখনো অনুমোদিত হয়নি এবং আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবুও যেসব মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কার্যকর করতে বাংলাদেশের ওপর চাপ আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্পনেতারা যা বলছেন
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদুল হাসান বাবু টিবিএসকে বলেন, শুল্ক বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে ব্যবহার বা ভোগ কমে যায়। একইভাবে শুল্ক কমলে পণ্যের দাম কমে। এতে ভোগ বা ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে পাল্টা শুল্ক বাতিল হওয়া আমাদের জন্য মন্দের ভালো বলে মনে করি।
তিনি বলেন, 'দেশটিতে ঘন ঘন শুল্ক পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। কখন শুল্ক হার কতো হবে- তা জানা না থাকায় আমদানিকারকরা আমদানি করে রিস্ক নিতে চান না। তবে রিটেইলারগুলো তাদের শেল্ফগুলো খালি রাখবে না। তারা কম কম পরিমাণে আমদানি করবে। এতে রপ্তানি কমতেও পারে।'
হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালনক এ কে আজাদ টিবিএসকে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন যে বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ পারস্পরিক শুল্ক ছিল ১৯ শতাংশ।
তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই রপ্তানিকারক মনে করেন, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক বাতিলের জন্য আদালতে যাবে দেশটির নাগরিকরা। কারণ এ ধরনের শুল্ক আরোপ বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিধিবিধান অনুমোদন করে না।
একই উদ্বেগ জানিয়ে দেশের অন্যতম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পুরো বিষয়টিকে অস্থায়ী ও অনিশ্চিত বলে বর্ণনা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য আগে থেকে অনুমান করতে পারা প্রায় শুল্ক হারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, হঠাৎ করেই অর্ডারের পরিমাণ খুব বেশি বেড়ে যাবে—এমনটা আশা করি না। মার্কিন ক্রেতারা সাধারণত কয়েক মাস আগে থেকে পরিকল্পনা শুরু করেন। আদালতের এই সিদ্ধান্ত আইনি অনিশ্চয়তা কমিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে।
তিনি এও সতর্ক করেছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি নতুন করে আরও কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আবারও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
