এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাতে ক্রমবর্ধমান দাবি সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছে সরকার
স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তররণ (এলডিসি গ্রাজুয়েশন) স্থগিত করার আবেদন জানানো উচিৎ সরকারের অব্যাহতভাবে এমন চাপ আসছে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে। কিন্তু, এসব দাবির মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার আগামী নভেম্বরের নির্ধারিত সময়েই গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। যদিও সর্বশেষ কান্ট্রি রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এখনো উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা ও ঝুঁকি পরিবেষ্টিত অবস্থায় আছে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএন-সিডিপি)–এর কাছে দাখিল করা বাংলাদেশ অ্যানুয়াল কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫–এ সরকার পুনরায় জানিয়েছে যে এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ রয়েছে বাংলাদেশ।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, "বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের তিনটি মানদণ্ডেই বাংলাদেশ সন্তোষজনক অবস্থান ধরে রেখেছে।"
প্রতিবেদনটি এমন এক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে, যে অর্থনীতি উন্নয়ন সোপানে এগোতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে দেশীয় অস্থিরতা ও বৈশ্বিক সংকটের তীব্র চাপের মুখেও লড়াই করছে—ইউক্রেন যুদ্ধ, লোহিত সাগরের শিপিং সংকট, গত বছরের ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের ধাক্কা থেকে শুরু করে নানা বহুমাত্রিক অভিঘাতের সাথে যুঝতে হচ্ছে।
এসব চাপ মোকাবিলায়, সরকার এখন গুরুত্ব দিচ্ছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতি পুনরুদ্ধারে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সঠিক পথে রাখায়। তবে প্রতিবেদন বলছে, ঝুঁকি হ্রাসের চেয়ে বরং তা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, "গত চার বছরে বহুমুখী ধাক্কা মোকাবিলা করেও বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সব মানদণ্ড পূরণ করেছে, যা ইউএন-সিডিপি-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে পুনরায় নিশ্চিত হয়েছে। সে অনুযায়ী, ২০২১ সালে শুরু হওয়া পাঁচ বছরের প্রস্তুতি মেয়াদ শেষে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তীর্ণ হবে।"
এর আগে, ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ইউএন-সিডিপি'র সদস্য ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যসহ দেশের বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি দেশের এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর তথ্য তুলে ধরে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘকে চিঠি লিখে এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর অনুরোধ করলে তা কাজে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরাসরি ইউএন-সিডিপি বা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে গ্রাজুয়েশন স্থগিতের আবেদন জানানোর পাশাপাশি নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরতে চাইলে বাংলাদেশ চাইলে এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম)–এর নতুন সুবিধাও ব্যবহার করতে পারে— সত্যিই যদি উত্তরণ পেছাতে চায়।
গ্রাজুয়েশনের আগেই আরও প্রস্তুতি নেওয়ার সময় চান ব্যবসায়ীরা, এজন্য তারা এটি পেছানোর দাবি তুললে গত সেপ্টেম্বরে এ আহ্বান জানান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয়।
ড. দেবপ্রিয় আরও উল্লেখ করেন, যদি কোনো দেশে "অপ্রত্যাশিত" বা "নিয়ন্ত্রণহীন" পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় দাবি করে— তবে তার প্রতিফলন কান্ট্রি রিপোর্টে থাকা উচিত।
তবে সরকারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বলছে—সরকার হয়তো স্থগিতের আবেদন করবে না।
সর্বশেষ কান্ট্রি-রিপোর্টে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ তিনটি সূচক— মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক—সবই পূরণ করেছে। যদিও অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জগুলোর তালিকাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
সরকার মনে করে, এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর জন্য আবেদন করলেও যেহেতু বাংলাদেশ তিনটি ক্রাইটেরিয়াই পূরণ করেছে, তাই জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ প্রক্রিয়া পেছানোর পক্ষে সদস্য দেশগুলোর সম্মতি পাওয়া যাবে না। ফলে পেছানোর আবেদন করে বাংলাদেশ অযথা 'বেইজ্জত' হতে চায় না।
এলডিসি গ্রাজুয়েশন সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, ''ব্যবসায়ীরা পেছানোর কথা বলছেন এবং কিছু রাজনৈতিক দলও না বুঝে তা সমর্থন করছে। কিন্তু আমাদের চেয়ে অনেক দুর্বল দেশ যখন এলডিসি গ্রাজুয়েশন হচ্ছে, তখন আমরা কেন পেছানোর আবেদন করব?''
'এলডিসি গ্রাজুয়েশন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত' উল্লেখ করে তিনি বলেন, ''সরকার কেন এলডিসি পেছানোর জন্য জাতিসংঘে আবেদন করবে? আবেদন দিয়ে জাতিসংঘে বেইজ্জতি হওয়ার কি কোন দরকার আছে? কারণ, গ্রাজুয়েশন পেছাতে হলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া লাগবে, যা পাওয়া সম্ভব হবে না।''
এদিকে কান্ট্রি রিপোর্টটি গত ১৫ বছরের একচেটিয়া শাসন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে প্রভাবিত হয়েছিল তার বিবরণও তুলে ধরেছে— যেখানে রয়েছে অলিগার্কদের দখলে অর্থনীতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির ফলে সৃষ্ট চোরতন্ত্রের পরিস্থিতির চিত্র।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতি ফিরিয়ে আনতে বিনিময় হার পেগ করা, বাজারভিত্তিক সুদের হার নির্ধারণ এবং সরকারি ব্যয় যৌক্তিকীকরণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়।
এরপর রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সমন্বিত সংস্কার বাস্তবায়নের ফলে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেখাতে শুরু করে—জিডিপি প্রবৃদ্ধির উন্নতি, মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়ে ওঠা—এসব উল্লেখ করা হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) দাখিল করা প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়েছে, "আগামী দিনে সরকার অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে এবং এসডিজির দিকে অগ্রযাত্রা বজায় থাকে।"
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়া (১৯৯৮) ও শ্রীলংকার (২০২২) মতো গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত হিসেবে, জুলাইয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ১২.৫ শতাংশ বেড়ে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের পুঁজিবাজারের পর [আঞ্চলিকভাবে] তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছিল।
এরপর ডিএসই সূচক নিম্নমুখী হয়ে সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে অঞ্চলের অন্যতম খারাপ পারফর্মার ছিল। তবে নভেম্বর থেকে পুনরায় বাজার স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখানো শুরু করেছে।
দায় বেড়ে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক—কঠিন পথ সামনে
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য বলছে—রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতির কারণে বছরের মাঝামাঝি যে মন্থরতা দেখা দিয়েছিল, সেখান থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটছে।
যদিও মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে, তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। তবে শিক্ষিত জনশক্তির মধ্যে বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে বিশেষ উদ্বেগের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ হিসেবে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষিত কর্মশক্তির শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতার বড় ধরনের অমিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ মন্থরতার কারণে রাজস্ব সংগ্রহ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। এর প্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরে জিডিপির ০.৫ শতাংশ সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও গত কয়েক বছরে নেওয়া বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পও পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এখনো বাংলাদেশকে "স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ" দেশ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করলেও, সংস্থাটির সাম্প্রতিক স্টাফ মিশন সতর্ক করেছে যে, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ঝুঁকির ক্যাটাগরি 'নিম্ন' থেকে 'মাঝারি'-তে উঠতে পারে।
কান্ট্রি রিপোর্টে সতর্ক করে বলা হয়েছে—"প্রায় তিন মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহ দিয়েই বাংলাদেশ তার সব বার্ষিক বৈদেশিক দায় পরিশোধ করতে পারবে—এমনকী সর্বোচ্চ চাহিদার সময়েও (অর্থবছর ২০২৬-২৭)"। তবে একইসঙ্গে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদের রেয়াতি বা সহজ শর্তের ঋণ লাভের সুযোগ ক্রমশ কমে যাওয়ায়— বাংলাদেশ এক নতুন ধরনের ঋণ ব্যবস্থাপনায় প্রবেশ করছে।
গত সরকারের সময়, ব্যাংকখাতে বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ (এনপিএল) জমে যাওয়ার কারণে এই খাত এখনও নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে—যদিও অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন, ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স প্রবর্তন এবং পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করার মতো কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, "ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গভর্নেন্স দুর্বলতার কারণে এনপিএল এখনও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।" এদিকে জ্বালানি ঘাটতি, আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ—এসব কিছুর কারণে শিল্পোৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়ছে।
এছাড়া, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত 'পারস্পরিক শুল্ক' বিশ্ববাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পারফরম্যান্স ও প্রতিযোগী সক্ষমতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যদিও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই শুল্ক কিছুটা কম করতে পেরেছে, "তবুও পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থা এলডিসি থেকে মসৃণ উত্তরণের পথে আরও বাধার সৃষ্টি করবে" বলা হয় প্রতিবেদনে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়াকেও শঙ্কার জায়গা হিসেবে রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে।
এলডিসি গ্রাজুয়েশন সামনে রেখে সরকার বন্দর, এনবিআর সংস্কারসহ ও ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, "গ্রাজুয়েশন পেছানোর আবেদন করলে আমলাদের কারণে তখন আর এসব সংস্কার করা যাবে না।"
জাতিসংঘের সিডিপিতে বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, "এটি রেগুলার রিপোর্ট। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সিডিপির যদি কোন প্রশ্ন থাকে, তা আমাদের জানাবে এবং আমরা ক্ল্যারিফিকেশন (ব্যাখ্যা) দেব। তার ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে সিডিপির বৈঠকে সংস্থাটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই শেষে আমাদের প্রস্তুতিতে তারা সন্তুষ্ট নাকি অসন্তুষ্ট—সে সিদ্ধান্ত জানাবে।"
ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মাধ্যমে পৃথক একটি পর্যালোচনা হচ্ছে জানিয়ে আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, "জাতিসংঘের রিপোর্টও সিডিপি বিশ্লেষণ করবে। তবে জাতিসংঘের কাছে ব্যবসায়ীরা একেকজন একেক দাবি করেছেন, তারা সমন্বিতভাবে কোন দাবি করেননি। কেউ তিন বছরের জন্য, আবার কেউ পাঁচ বছরের জন্য [এলডিসি গ্রাজুয়েশন] পেছাতে বলেছেন।"
টেকসই এলডিসি গ্রাজুয়েশনের জন্য সরকার একটি স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ কৌশলের বাস্তবায়ন নিরীক্ষণের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় উত্তরণ প্রস্তুতি কর্মকাণ্ডকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "এলডিসি গ্রাজুয়েশনের তিন শর্ত পূরণের তথ্য উল্লেখ করে সরকার যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, তা খুবই যৌক্তিক। কারণ, আমাদের পরিসংখ্যানের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও—সরকার অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিতে পারে না।"
তিনি বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের জন্য তিনটি ক্রাইটেরিয়া পূরণ করলেও —টেকসই গ্রাজুয়েশনের ক্ষেত্রে আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে, এসটিএস বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে। "গতবছরের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং আগামী নির্বাচনের কারণে এসটিএসে বিদ্যমান ১৫৭টি ডেলিভ্যারিয়েবলস বাস্তবায়ন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে। তাই গ্রাজুয়েশনের জন্য তিন বছর বাড়তি সময় পেলে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। সামোয়া, এঙ্গোলাসহ কয়েকটি দেশ তাদের এলডিসি গ্রাজুয়েশন পিছিয়েছে।"
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমে গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আছে। যদিও কিছু সহযোগী দেশ গ্রাজুয়েশনের পরও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দেবে, তবুও এলডিসি গ্রাজুয়েশন হলে ট্রিপস -এর শর্তে ওয়েভার পাওয়ার বিষয়ে এখনও ডব্লিউটিও থেকে প্রতিশ্রুতি মিলেনি। তবে এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর আবেদন করলেও আমাদের অবশ্যই প্রস্তুতি নিতে হবে।"
এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর আবেদন করলে, জাতিসংঘ তা অনুমোদন করবে কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "সে সিদ্ধান্ত হবে [জাতিসংঘের] সাধারণ অধিবেশনে। তার আগে সিডিপি এ বিষয়ে তাদের মতামত দেবে। আগামী ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে সিডিপির ফর্মাল বৈঠক হবে। ওই সময় আমাদের দৃষ্টি নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের দিকে ঘুরে যাবে।''
বাংলাদেশ আগ্রহী হলে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আগে যেকোন সময় সরকার এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর আবেদন করতে পারবে বলেও জানান তিনি।
এসটিএস বাস্তবায়ন-বিষয়ক সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি সরকারকে এলডিসি গ্রাজুয়েশন পেছানোর জন্য কোন সুপারেশ করেছে কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ''এ বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করার কোনও ম্যান্ডেট এই কমিটির নেই। কমিটির ম্যান্ডেট হলো এসটিএস বাস্তবায়ন মনিটর করা। তারপরও সরকার যদি এ বিষয়ে কমিটির মতামত জানতে চাইতো, তাহলে আমি জানাতাম। কিন্তু, সরকার নিজেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।''
