ইউক্রেনে পলায়নপর নারীরা প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য পেছনে রেখে যাচ্ছে স্বামী, সন্তানকে
ইউক্রেনের সবচেয়ে পশ্চিমে, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে এলভিভ রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেকে নামছে হাজারো ইউক্রেনীয়। রুশ আগ্রাসনের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন তারা, খুঁজছেন পরবর্তী নিরাপদ আশ্রয় কী হতে পারে!
এতদিন যাবত এই টার্মিনাল ছিল ইউরোপে আর্ট ন্যুভো স্থাপত্যের সবচেয়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিন্তু এই মুহূর্তে তা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের নাগরিকদের অনিশ্চিত পদচারণায় পূর্ণ। রাশিয়ান সেনা ও নিজেদের মধ্যে মাইলের পর মাইল ব্যবধান বাড়াতে চাইছেন তারা; একই সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রায় ন্যাটো ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি।
ঐতিহাসিক এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিও যে কখনো মস্কোর নিশানা হয়ে উঠতে পারে, তা বিশ্বাস করেননি অনেকেই। কিন্তু সাইরেনের শব্দ বন্ধ হতেই যেন সবাই উপলব্ধি করলো, ইউক্রেনের কোনো অঞ্চলই এখন মস্কোর সামরিক হামলা থেকে নিরাপদ নয়।
সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে উঠলেও স্টেশনের বাইরের চত্বরে আনমনে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায় করেকজনকে। সন্তানের গায়ে লেপ-চাদর জড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রিয় পোষা প্রাণীকেও সোয়েটারে জড়িয়েছেন ইউক্রেনীয়রা। ব্যারিকেডের বাইরে ব্যাগ-স্যুটকেস নিয়ে অপেক্ষা করছে অনেক পরিবার। জানালেন, শত্রুর বোমাবর্ষণের শব্দে গত কয়েকদিন ঘুমাননি তারা।
ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এলভিভ স্টেশনে এসে জড়ো হয়েছেন তারা। চলমান সহিংসতার মধ্যে এখনো জানেননা, পরবর্তী গন্তব্য কী! ইউক্রেনে জারি করা মার্শাল আইনের কারণে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য বিধিনিষেধের পাশাপাশি ১৮-৬০ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় পুরুষদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তাই সীমান্ত পার হয়ে শরণার্থীতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি, প্রিয়জন ছাড়ার বেদনাকেও সঙ্গী করতে হচ্ছে তাদের। স্বামী, ছেলে কিংবা ভাইকে ছেড়ে আসতে হয়েছে এসব সাধারণ মানুষকে।
কিয়েভ থেকে শ্বাশুড়ি ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে এলভিভে পৌঁছেছেন আর্তেম জোনেনকো। রুশ সেনাদের বোমা থেকে বাঁচতে আগেরদিন রাত কাটিয়েছেন রাজধানীর একটি সাবওয়ে স্টেশনের মেঝেতে। জোনেনকোকে ছেড়েই তার স্ত্রী-মেয়ে ও শ্বাশুড়ি পোল্যান্ডে পাড়ি জমাবেন কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একদিন একদিন একসঙ্গে থাকবেন তারা।
এই পরিস্থিতিতে কেমন লাগছে জানতে চাইলে হতাশার হাসি হেসে জোনেনকো বললেন, "আমি জানিনা আপনাকে কি বলবো। কিন্তু এটাই আমাদের বাস্তবতা।"
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রুশ সামরিক অভিযানের প্রথম ২৪ ঘন্টায় ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন ইউক্রেনের ১০০,০০০ মানুষ। পোলিশ সীমান্তে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনে ৭০০০ গাড়ি আটকে ছিল বলে জানায় ইউক্রেনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ও এক প্রত্যক্ষদর্শী।
সরকারি আইনের প্রতিবাদ করে আন্দ্রেই (ছদ্মনাম) নামক জনৈক ইউক্রেনীয় বলেন, "আমার স্ত্রী গর্ভবতী, সে পোল্যান্ডে আছে। আমাকে তার পাশে থাকতে হবে। এই আইনের কোনো মানেই হয় না।"
দেশের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার 'সাধারণ-স্থানান্তর' প্রক্রিয়ায় পুরুষদের বাদ দিয়েছে ইউক্রেন। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, "আমি হতবাক। মাত্রই ট্রেন থেকে নেমেছি, জানিও না কোথায় আশ্রয় নিতে হবে। এখন আমাকে বলা হচ্ছে, দেশ ছাড়তে পারবো না; অথচ অভিবাসীরা পারবে। এটা কি ন্যায়বিচার হলো?"
এলভিভে আসা অভিবাসীদের জন্য গন্তব্য নিশ্চিত, পোল্যান্ড কিংবা প্রতিবেশী অন্য কোনো দেশ তাদের আশ্রয় দিবে। কিন্তু তবুও ভয় কাটছে না তাদের। ওডেসা থেকে আসা একদল আলজেরিয়ান শিক্ষার্থী পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে করতে বলেন, "আমরা পোল্যান্ডে যাবো, আমরা শুধু এই দেশ ছাড়তে চাই এখন। আমরা ভাবতেও পারিনি ইউরোপে এমন কিছু হবে, আরও হাজার বছর পরেও এমন যুদ্ধ কল্পনা করিনি!"
সীমান্তের শহর মসটিস্কাতে নিজের সাবেক স্ত্রী-কন্যাকে বিদায় দিতে এসেছেন ৫২ বছর বয়সী ইয়র নাকোনেচি। পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি তাদেরকে বিদায় দিয়ে ফিরে যাবেন তিনি। তবে আইনের বাধার জন্য নয়, দেশের হয়ে লড়াই করতে চান তিনি। নাকোনেচি বলেন, "পরিস্থিতিটা কঠিন, কিন্তু আমি আইন নিয়ে চিন্তিত নই। রুশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করাই এখন সঠিক কাজ বলে মনে করি আমি।"
সূত্র: সিএনএন
