লালপুরে বছরে দেড়শ কোটি টাকার শুটকির বাজার, করোনার কারণে ১২ কোটি টাকার ক্ষতি
করোনার কারণে আশুগঞ্জ উপজলোর লালপুর গ্রামের শুটকি পল্লীর উৎপাদিত বেশিরভাগ শুটকি অবিক্রিত থাকায় এখানকার ব্যবসায়ীরা অর্থ সংকটে ভুগছেন। পুঁজির সংকট থাকায় ব্যবসায়ীরা নতুন মৌসুমের জন্য চাহিদামত মাছ কিনতে পারছেন না যার ফলে চলতি মৌসুমে তাদের শুটকি উৎপাদন দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া শুটকি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের স্টক করে রাখা শুটকি নষ্ট হয়ে প্রায় ১২ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের। জানা যায়, লালপুর গ্রামের শুটকির সুনাম রয়েছে দেশব্যাপী। এখানকার শুটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাতকরণের পাশাপাশি ভারতসহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রফতানি করা হয়।
শুটকি ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্টরা জানান, লালপুর গ্রামের শুটকি পল্লী থেকে বছরে বাজারজাত করা হয় প্রায় দেড়শ কোটি টাকার শুটকি। বাজারজাত করা এসব শুটকির সব ব্যয়ভার মেটানোর পর ব্যবসায়ীদের মুনাফা হয় প্রায় দশ শতাংশ।
জানা যায়, শত বছর ধরে লালপুর গ্রামের শুটকি পল্লীতে কয়েকশ পরিবার শুটকি তৈরি করে আসছেন। গ্রামের মেঘনা নদীর পূর্বপাড়ে ছোটছোট মাচায় শুকোনো হয় এসব শুটকি। এদের মধ্যে কেউ মাছ কিনে শুটকি ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করেন। কেউ মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুটকি তৈরি করেন।
মূলত দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছের শুটকি তৈরি হয় এই পল্লীতে। এর মধ্যে পুঁটি, শোল, টাকি, ট্যাংরা ও বাইম অন্যতম। দেশীয় মাছ ছাড়াও সামুদ্রিক মাছের শুটকিও তৈরি করা হয় এখানে। বর্তমানে আকার ভেদে
প্রতি কেজি শোল শুটকি ৭০০ থেকে ১৬০০ টাকা, প্রতি কেজি টাকি শুটকি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা, প্রতি কেজি বাইম শুটকি ৭০০ থেকে ১৬০০ টাকা আর প্রতি কেজি ট্যাংরা শুটকি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লালপুর শুটকি পল্লীতে ছোট, মাঝারী ও বড় মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক ব্যবসায়ী আছেন। এসব ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমিতি ও এন জিওদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা এনে ব্যবসা করেন। আর বড় ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করেন ব্যাংক ঋণ নিয়ে। এবার করোনার কারণে ব্যবসা মন্দা হওয়ায় অধিকাংশ ব্যবসায়ীই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
শুটকি ব্যবসায়ীরা জানান, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কালকে শুটকি ব্যবসার মৌসুম ধরা হয়। বছরের এসময়ে প্রচুর পরিমাণে মাছ ধরা পড়ে ফলে এসময় মাছ সংগ্রহ করে পুরো পাড়ায় চলে শুটকি তৈরির হিড়িক। অক্টোবর- মার্চে উৎপাদিত শুটকির মধ্যে কিছু শুটকি স্টকে রাখা হয় বছরের বাকী ছয়মাস বাজারজাত করণের জন্য। কিন্তু দীর্ঘদিন গুদামে শুটকি পড়ে থাকার কারণে বেশিরভাগ শুটকি নষ্ট হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, কিছু শুটকি আছে যেগুলো তিন মাসের বেশি সংরক্ষণ করা যায় না।
শুটকি পল্লীর ব্যবসায়ী সুকমল দাস জানান, ছোট ব্যবসায়ী বিধায় ব্যাংক ঋণ না পেয়ে আমাকে বিভিন্ন সমিতি বা এন জিওর কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ করতে হয় ফলে খুব বেশি লাভ থাকে না। করোনার কারণে পাইকাররা না আসায় স্টক করা শুটকি পড়ে আছে। আমার স্টকে ১০-১২ লাখ টাকার শুটকি আছে যেখানে আমাকে লোকসান গুনতে হবে ৩/৪ লাখ টাকা। আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদেরকে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে। শুটকি ব্যবসায়ী সুমন দাস ১৪ বছর ধরে এই ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, করোনার কারণে বিগত বছরের শুটকিগুলো অর্ধেক দামেও বিক্রি বিক্রি করতে পারব না- এতে করে আমার ১০-১২ লাখ টাকার ক্ষতি হবে। এবছর আমরা টাকার অভাবে মৌসুমের মাছ কিনতে পারছি না।
ব্যবসায়ী নিখিল দাস করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানিয়ে জানান, নতুন মৌসুমে পুঁজির অভাবে তিনি মাছ কিনতে পারবেন না। এখন যদি সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে ঋণ পাই তাহলে আমার মতো আরও অনেক ব্যবসায়ী ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন। এপ্রসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ব্যাংকার্স ফোরামের সভাপতি ও সোনালী ব্যাংকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন ভুইয়া জানান, করোনা মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য চার শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এখন ক্ষতিগ্রস্তরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা প্রয়োজনীয় জামানতের বিপরীতে তাদেরকে দ্রুত ঋণ দিতে পারব।
