প্রত্যন্ত বাজারে পুরনো দরজা-জানালার কোটি টাকার কারবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার প্রত্যন্ত অরুয়াইল বাজারে কীটনাশক বিক্রি করেন মো. অহিদ মিয়া। কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময়ই তার এই ব্যবসায় মন্দা থাকে। সেজন্য বিকল্প হিসেবে পুরনো দরজা-জানালার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এ ব্যবসা থেকে এখন মাসে ভালো আয় হচ্ছে তার।
অরুয়াইল বাজারের এই দরজা-জানালার ব্যবসায় বছরে লেনদেন হয় প্রায় ৫ কোটি টাকা। তবে করোনাভাইরাসের কারণে এখন ব্যবসা খুব বেশি ভালো যাচ্ছে না। যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তাহলে ব্যবসা আবার চাঙা হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অরুয়াইল বাজারে প্রায় ১০ বছর আগে পুরনো দরজা-জানালার ব্যবসার সূচনা হয়। বর্তমানে বাজারের ১২ জন ব্যবসায়ী এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। একেকজন ব্যবসায়ী মাসে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন পুরনো দরজা-জানালা বিক্রি করে। তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় আরও অনেকেই এ ব্যবসায় আসতে চাইছেন।
সেগুন, আকাশী, গামারী, লোহা ও কাঁঠালসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠের দরজা-জানালা মিলবে অরুয়াইল বাজারের দোকানগুলোতে। এছাড়া দোকানগুলোতে পাওয়া যায় স্টিলের দরজাও। কাঠ ও আকার অনুযায়ী একেকটি দরজা বেচাকেনা হয় ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে। আর জানালাগুলো বিক্রি হয় ৯০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত দরে। মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্তরাই এসব পুরনো দরজা-জানালার ক্রেতা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পুরনো বাসা-বাড়ি ও অফিস ভেঙে ফেলার পর দরজা-জানালাগুলো স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনে আনেন অরুয়াইল বাজারের ব্যবসায়ীরা। দুই পার্টের দরজাগুলোর একেকটি সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় কিনেন তারা। আর এক পার্টের দরজাগুলো কিনতে হয় ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে।
খরচ বাদ দিয়ে দুই পার্টের দরজাগুলো বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের লাভ হয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। আর এক পার্টের দরজায় লাভ হয় ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। প্রতি বছর অন্তত ৬-৭ হাজার পিস পুরনো দরজা-জানালা বেচাকেনা হয় অরুয়াইল বাজারে। গড়ে যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। সরাইল ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা অরুয়াইল বাজার থেকে পুরনো দরজা-জানালা কিনেন। সাধ্য অনুযায়ী কম দামে দরজা-জানালা কিনতে পেরে খুশি ক্রেতারাও।
অরুয়াইল ইউনিয়নের বড়ইছড়া গ্রামের বাসিন্দা মনসুর আলী জানান, বাড়ির সংস্কার কাজ করার সময় তিনি অরুয়াইল বাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় পাঁচটি দরজা কিনেন। এই দরজাগুলো নতুন বানাতে গেলে তার খরচ পড়ত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু এত টাকা দিয়ে দরজা বানানোর সাধ্য ছিলনা তার। পুরনো দরজা-জানালা কিনতে পারায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য অনেক সুবিধা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুরনো দরজা-জানালার ব্যবসায়ী মো. অহিদ মিয়া বলেন, "আমি ৬ বছর ধরে কীটনাশক ব্যবসার পাশাপাশি পুরনো দরজা-জানালার ব্যবসা করছি। বছরে গড়ে ৪০০ পিস দরজা-জানালা বিক্রি করতে পারি। মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্তরাই আমাদের ক্রেতা। সাধ্যমতো দামে কিনতে পেরে ক্রেতারা যেমন খুশি, তেমনি ব্যবসা ভালো হওয়ায় আমরাও খুশি। এ ব্যবসা থেকে সকল খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসে আমার ৩০-৩৫ হাজার টাকা আয় হয়। এখন করোনার কারণে ব্যবসা কিছুটা মন্দা। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যবসা আবার চাঙা হয়ে উঠবে"।
আনোয়ার হোসেন নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, "আমাদের সারা বছরই ব্যবসার মৌসুম। তবে এখন করোনাভাইরাস পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ব্যবসা মন্দা চলছে। আগে প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকা লাভ হতো এ ব্যবসা থেকে। করোনাভাইরাসের কারণে এখন বেচাকেনা অনেক কমে গেছে"।
৯ বছর ধরে পুরনো দরজা-জানালার ব্যবসায় যুক্ত থাকা নাসির উদ্দিন বলেন, "প্রতি বছর আমাদের অরুয়াইল বাজার থেকে অন্তত ৫ কোটি টাকার পুরনো দরজা-জানালা বেচাকেনা হয়। আমার দোকানে করোনার প্রকোপ শুরুর আগে বছরে ১ হাজার দরজা-জানালা বিক্রি হতো। এখন করোনার কারণে বেচাকেনা অর্ধেকেরও কম হচ্ছে। পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা ব্যবসার মাধ্যমেই পুষিয়ে নেওয়া যাবে"।
অরুয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূইয়া বলেন, "অরুয়াইল বাজারের পুরনো দরজা-জানালার ব্যবসার ফলে এলাকার অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সাধ্যমতো দামে দরজা-জানালা কিনতে পারছেন। এতে করে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা- দুই শ্রেণিই লাভবান হচ্ছেন। করোনার প্রভাব কাটাতে ব্যবসায়ীরা চাইলে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে"।
