যুদ্ধের ইতি টানার মার্কিন প্রস্তাবে সাড়া দিতে কেন সময় নিয়েছে ইরান?
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ—যে সংঘাত এখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে—তার ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখতে সময় নিচ্ছে তেহরান। বিপরীতে ইরানের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন। এই যুদ্ধ বর্তমানে লেবানন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পাশপাশি তেহরান কর্তৃক কৌশলগত 'হরমুজ প্রণালি' অবরোধের ফলে, বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল, শুক্রবারের মধ্যেই ইরান জবাব দেবে, কিন্তু তেহরান বলছে তারা এখনো প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। ইরানের দাবি, যেকোনো চুক্তি অবশ্যই 'ন্যায়সংগত ও পূর্ণাঙ্গ' হতে হবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন একটি ১৪ দফার প্রস্তাব পাঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্ততাকারীদের মাধ্যমে। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তত ১২ বছরের জন্য বন্ধ রাখা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। বিনিময়ে ইরানের ওপর কয়েক দশক ধরে চলমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শুরু হওয়া শান্তি আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যু। ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে হরমুজের জলপথে মাঝেমধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর তেহরান এই জলপথটি বন্ধ করে দেয়।
মার্কিন প্রস্তাবে যা আছে এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া কী?
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, ওয়াশিংটনের প্রস্তাবে ইরানকে অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখা এবং ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ইরানকে তাদের কাছে মজুত থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম (যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ) হস্তান্তর করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের স্তরে পৌঁছাক।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বলেন, তিনি "খুব শিগগিরই" ইরানের জবাব পাবেন বলে আশা করছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও এক ধাপ এগিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জবাব পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন। ইতালি সফরকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "দেখি তাদের জবাবে কেমন হয়। আমি আশা করি, সেটা এমন কিছুই হবে যা নিয়ে আমরা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে পারব।"
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শুক্রবার জানিয়েছেন, তেহরান এখনো প্রস্তাবটি চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে এবং জবাব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
কেন এই বিলম্ব?
আল জাজিরার প্রতিনিধি রসুল সেরদার আতাস জানিয়েছেন, শুক্রবার জবাব আসার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। এই বিলম্বের একটি বড় কারণ হলো মার্কিন প্রস্তাবের 'অত্যন্ত কারিগরি বা টেকনিক্যাল ভাষা'। ইরানি আলোচকরা চুক্তির প্রতিটি তারিখ এবং শব্দের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এছাড়া যেকোনো জবাব পাঠানোর আগে ইরানের একাধিক উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সেটি অনুমোদিত হতে হয়।
আতাস আরও জানান, শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি-কেই এই চুক্তিতে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিতে হবে।
দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি মনে করেন, বিলম্বের মাধ্যমে ইরান সম্ভবত এই বার্তা দিতে চাইছে যে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং দরকষাকষিতে তাদের পাল্লাই ভারী। তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন প্রশাসন কূটনৈতিক আলোচনায় অনভিজ্ঞ এবং ট্রাম্পের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়— তারা দ্রুত কোনো চুক্তি করতে ভীষণ অধৈর্য হয়ে পড়েছে।
ইরানের শর্তগুলো কী কী?
আল জাজিরার সূত্রমতে, ইরানি কর্মকর্তারা 'তিন-ধাপের একটি পদ্ধতি' অনুসরণ করছেন। প্রথম ৩০ দিনের ধাপে তারা লেবাননের হিজবুল্লাহসহ 'সকল ফ্রন্টে' স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা চান। তবে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের পক্ষে গ্যারান্টি দেওয়া বেশ কঠিন। গত ১৭ এপ্রিল থেকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি চললেও দেশটির সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাথে হিজবুল্লাহর লড়াই অব্যাহত রয়েছে। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে লেবাননে ২,৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরান আরও দাবি করছে যে, তাদের ওপর পুনরায় হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা আসতে হবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবিও রয়েছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুদ্ধের পর কৌশলগত পরিবেশ বদলে গেছে। তারা এখন হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের আগের পর্যায়ের চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রাখতে দেবে না।
সেরদার আতাস বলেন, "আমেরিকানদের জন্য এটি মেনে নেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি এই অঞ্চলের অনেক দেশের জন্য তা গ্রহণ করাও বেশ দুষ্কর," তিনি বলেন।
অন্যদিকে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান অনড়। তারা তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলতে বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাতে রাজি নয়। গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনার বিষয়ে মার্কিন নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "প্রতিবার যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ আসে, যুক্তরাষ্ট্র তখনই কোনো বেপরোয়া সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়।" তিনি ২০২৫ সালের জুনে আলোচনার মাঝপথে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং বর্তমান যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রেও যে যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী—সেই উদাহরণ টানেন।
