রাডার ধ্বংসের পরই ইরানে ঝরছে বৃষ্টি? নেপথ্যে কি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ‘আবহাওয়া অস্ত্র’?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ইরানপন্থী বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে সম্প্রতি অদ্ভুত এক দাবি করা হয়েছে। তাদের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা একটি 'গোপন ক্লাউড-সিডিং (কৃত্রিম বৃষ্টি) ও আবহাওয়া পরিবর্তন কেন্দ্র' ধ্বংস করেছে ইরান। আর এর পরপরই দেশটির আবহাওয়ায় আমূল পরিবর্তন এসেছে।
এমনই একটি পোস্টে বলা হয়েছে, 'হঠাৎ করেই ইরাক ও ইরানে প্রতি সপ্তাহে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তাপমাত্রা এক ধাক্কায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে।' ইরানের ভয়াবহ খরা শেষ হয়েছে বলেও এতে জানানো হয়।
ওই পোস্টে আরও দাবি করা হয়, 'ওই কেন্দ্রটি শুধু গবেষণার জন্য ছিল না—কৃত্রিম খরা ও মরুকরণ সৃষ্টির মাধ্যমে ইরান ও ইরাকের কৃষি এবং গবাদিপশু ধ্বংস করাই ছিল এর আসল উদ্দেশ্য।'
ইরান যে কয়েক বছর ধরে তীব্র পানিসংকটে ভুগছে, তা সত্যি। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) মতে, টানা পাঁচ বছরের খরা এবং অপরিকল্পিত পানি ব্যবহারের কারণে দেশটি এখন 'ওয়াটার ব্যাংকরাপসি' বা পানির দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছে।
চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত ডব্লিউআরআইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, 'গত বছর রাজধানী তেহরানের পানি প্রায় ফুরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পানির অভাব এবং কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে কৃষকেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন।'
সংস্থাটি জানায়, মূলত ইরানের প্রাকৃতিকভাবে শুষ্ক আবহাওয়া, সীমিত পানিসম্পদ এবং বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনাই এই সংকটের প্রধান কারণ।
তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আবহাওয়া পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের দেশে খরার মাত্রা বাড়িয়েছে। অতীতে ইরানি কর্মকর্তারা 'মেঘ ও তুষার চুরির' মতো অভিযোগও করেছিলেন।
সম্প্রতি কিছু ইরানপন্থী ওয়েবসাইট দাবি করেছে, কাতারে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং এএন/এফপিএস-১৩২ আগাম সতর্কীকরণ রাডার ধ্বংস করার পরই এই কথিত 'আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক' বিকল হয়ে গেছে।
একটি পোস্টে বলা হয়, 'ইরানের আবহাওয়া এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ব্যাপক বৃষ্টি, তুষারপাত হচ্ছে এবং তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কেন? কারণ এই অঞ্চলে আমেরিকান রাডারগুলো ধ্বংস হওয়ার পর তাদের আবহাওয়া পরিবর্তন বা ওয়েদার ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধ হয়ে গেছে।'
তবে এক্সের নিজস্ব এআই সিস্টেম 'গ্রক'-এর করা এক ফ্যাক্ট-চেকে এই দাবিগুলোকে মিথ্যা বলে জানানো হয়েছে।
গ্রক জানায়, 'ইরানে এখন ভারী বৃষ্টি, তুষারপাত এবং শীতল তাপমাত্রার কথা সত্যি। বছরের পর বছর খরার পর এপ্রিলের শেষের দিকে এই অস্বাভাবিক তুষারপাত ও বন্যার বিষয়টি অনেক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাডার ধ্বংসের কারণে "ওয়েদার ইঞ্জিনিয়ারিং" বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এমনটা ঘটছে—এই দাবি নিছক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।'
গ্রক আরও জানায়, যেসব সিস্টেম ধ্বংস হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মূলত সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার। এগুলো কোনো আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নয়। তা ছাড়া রাডারের মাধ্যমে বড় পরিসরে আবহাওয়া পরিবর্তনেরও কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাতের মতো আবহাওয়া পরিবর্তনগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই ঘটতে পারে। জলবায়ুর ধরন পরিবর্তনের কারণেই এমনটা হয়, এর পেছনে মানুষের কোনো হাত নেই।
