ট্রাম্পের দাবি নাকচ করলেন মার্কিন কর্মকর্তারাই, জানালেন ইরানের শক্তি এখনো অটুট
হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন প্রকাশ্যে যা দাবি করছে, ইরানের সামরিক শক্তি তার চেয়েও অনেক বেশি। গোয়েন্দা তথ্যের ব্যাপারে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে এ কথা জানিয়েছেন।
সিবিএস নিউজকে তিনজন কর্মকর্তা জানান, গত এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময়ও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং এর লঞ্চ সিস্টেমের (ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ব্যবস্থা) প্রায় অর্ধেকই অক্ষত ছিল।
ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌ শাখার প্রায় ৬০ শতাংশই এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে তাদের দ্রুতগামী আক্রমণকারী নৌকাগুলোও রয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শান্তি আলোচনার জন্য একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন, তার কিছুক্ষণ পরই হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় ইরানি গানবোটগুলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানান, ইরানের বিমানবাহিনী বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও ইরানের বিমানবাহিনীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখনো কার্যকর রয়েছে।
ট্রাম্প ও হেগসেথের দাবি
এর আগে ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামের এই মার্কিন অভিযানকে অত্যন্ত সফল বলে দাবি করেছিলেন। তাদের ভাষ্য ছিল, এই অভিযানের মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প বলেছিলেন, 'আমরা তাদের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং শীর্ষ নেতাদের শেষ করে দিয়েছি।'
৮ এপ্রিল ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই পেন্টাগনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেন, 'অপারেশন এপিক ফিউরি ছিল একটি ঐতিহাসিক ও নিরঙ্কুশ বিজয়; সামরিক ভাষায় যাকে "বড় হাতের ভি" (একতরফা বিজয়) বলা যায়।'
তিনি আরও দাবি করেন, 'যে মাপকাঠিতেই বিচার করুন না কেন, এপিক ফিউরি ইরানের সামরিক বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের জন্য তাদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।'
ধ্বংস হয়েছে শুধু সাধারণ নৌবাহিনী
সিবিএস নিউজকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের প্রথাগত নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
কিন্তু আইআরজিসির নৌ শাখাটি মূলত 'অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার' বা অপ্রতিসম যুদ্ধের (যেখানে এক পক্ষ দুর্বল হলেও গেরিলা বা চোরাগোপ্তা কায়দায় লড়াই করে) জন্য তৈরি। এতে অনেক ছোট ছোট নৌযান রয়েছে, যার অনেকগুলোই এখনো অক্ষত। কর্মকর্তারা জানান, মূলত আইআরজিসির এই নৌবাহিনীই হরমুজ প্রণালিতে তেলের জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে।
হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানির আগে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল জেমস অ্যাডামসও জানিয়েছেন যে ইরান এখনো ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে।
তিনি লেখেন, 'যুদ্ধের কারণে ইরানের সক্ষমতা কমলেও, তাদের হাতে এখনো হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র এবং একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন রয়েছে। এগুলো দিয়ে তারা এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।'
এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, ১৩ হাজারের বেশি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাধ্যমে এই যুদ্ধ সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, '৪০ দিনেরও কম সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি প্রশাসনের ওপর একের পর এক আঘাত হেনে একে পঙ্গু করে দিয়েছে।'
পার্নেল দাবি করেন, ইরানি নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোর ৯২ শতাংশই ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৪৪টি মাইনলেয়ার (মাইন বসানোর জাহাজ) গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, 'মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এত বড় কোনো নৌবাহিনী ধ্বংস করার ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই প্রথম।'
পার্নেল আরও বলেন, 'আমাদের যোদ্ধাদের এই দৃঢ়তায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ অত্যন্ত গর্বিত। তবে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তাদের এই প্রচেষ্টাকে খাটো করার চেষ্টা করছে।'
