এভিয়েশনে ঝাঁকুনি দিয়েছে ইরান যুদ্ধ, সংঘাত দীর্ঘ হলে যেভাবে বদলাবে বিমানযাত্রা
একসময় বৈশ্বিক যাত্রাবাহী উড়োজাহাজ চলাচলের মানচিত্রে তেমন গুরুত্ব না পাওয়া একটি ছোট্ট বিরতিস্থল ছিল দুবাই। যুক্তরাজ্য থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দূরবর্তী অঞ্চল—যেমন ভারত ও অস্ট্রেলিয়াগামী বিলাসবহুল ফ্লাইং বোট উড়োজাহাজগুলোর জন্য এটি ছিল ধুলোমাখা এক রাতের যাত্রাবিরতি। ১৯৬০-এর দশকে এখানে ছিল মরুভূমির বালু দিয়ে তৈরি একটি সাধারণ রানওয়ে, যেখানে মূলত অন্যান্য প্রধান গন্তব্যমুখী বিমান নামত জ্বালানি ভরার জন্য। এক কথায়, আজকের দুবাই তখন মোটেই আকর্ষণীয় কোনো গন্তব্য ছিল না।
কিন্তু আজ সেই দুবাই-ই বৈশ্বিক বিমান চলাচলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, আর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (ডিএক্সবি) এর প্রাণকেন্দ্র। ২০২৪ সালে ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি যাত্রী এই ঝকঝকে মার্বেল-ফ্লোর ও আলোকোজ্জ্বল শপিংমলসমৃদ্ধ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন।
এতে ডিএক্সবি আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনে বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরে পরিণত হয়েছে—যা এমনকী লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরকে ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে একই বছরে যাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ। শুধু দুবাই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের আবু ধাবি এবং দোহার বিমানবন্দরগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে, যেগুলো মিলিয়ে আরও প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই তিনটি উপসাগরীয় হাব প্রতিদিন ৩,০০০-এর বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করে, যার বেশিরভাগই স্থানীয় এয়ারলাইন—এমিরেটস, ইতিহাদ এবং কাতার এয়ারওয়েজের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক বিমান চলাচলেও নাটকীয় প্রভাব ফেলেছে। প্রথমে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আকাশসীমায় ফ্লাইট চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে, বড় বড় বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ আটকে যায় এবং লক্ষাধিক যাত্রী বিপাকে পড়ে। এখনো এই অঞ্চলের আকাশপথ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত।
এরপর আসে জ্বালানি সংকট। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় রিফাইনারি থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই অঞ্চল সাধারণত ইউরোপের জেট ফুয়েল আমদানির প্রায় অর্ধেক জোগান দেয়। সংঘাত শুরুর পর থেকেই জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হয়েছে, ফলে অনেক এয়ারলাইন ফ্লাইট কমাতে শুরু করেছে।
স্বল্পমেয়াদে এসব বিষয়ই এভিয়েশন শিল্পখাতের মূল উদ্বেগ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে, বহুলাংশে সফল "গালফ মডেলে" বিমান চলাচল—যা দীর্ঘ দূরত্বের ভ্রমণ সহজ ও সাশ্রয়ী করেছে—তা কতটা টিকে থাকবে, সেটিই এখন আলোচনায়।
আর এর প্রভাব শুধু বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের সেইসব যাত্রী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, যারা এই অঞ্চলের বিস্তৃত বিমান সংযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
যাত্রী টার্মিনালে বিশৃঙ্খলা
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পর উপসাগরীয় বিমানবন্দরগুলো কার্যত থমকে যায়। আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক বিমান মাটিতে আটকে পড়ে, এমনকি আকাশে থাকা কিছু ফ্লাইটও ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
দুবাই, আবুধাবি ও কাতারে হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েন, যাদের অনেকেই কেবল ট্রানজিটের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে পড়ে, ফলে বিমানবন্দর ও হোটেলগুলোতে আটকে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আরও বহু যাত্রী তাদের নির্ধারিত যাত্রা সম্পন্ন করতে পারেননি, কারণ তাদের ফ্লাইটগুলো উপসাগরীয় হাব হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বিকল্প খুঁজতে গিয়ে তারা বিপাকে পড়েন।
কয়েক দিনের মধ্যে এমিরেটস ও ইতিহাদ সীমিত ফ্লাইট চালু করে যাত্রীদের ফেরানোর চেষ্টা শুরু করে, পরে কাতার এয়ারওয়েজও একই পথে হাঁটে। অন্যান্য দেশ থেকেও ফ্লাইট চালু হয়, এমনকি যুক্তরাজ্যসহ কিছু দেশ নিজস্ব বিমান ভাড়া করে নিজ নাগরিকদের সরিয়ে নেয়।
এরপর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ফ্লাইট সূচি এখনো সীমিত এবং অনিশ্চিত। বিশ্লেষক সংস্থা সিরিয়াম-এর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যগামী ৩০ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে, কারণ যাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তাদের একজন, অস্ট্রেলিয়ার ইয়ান স্কট, মেলবোর্ন থেকে দোহা হয়ে ভেনিস যাচ্ছিলেন। মাঝপথে তার ফ্লাইট ফিরে আসতে বাধ্য হয়, পরে কয়েকদিন হোটেলে থাকার পর তিনি মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ওমানে গিয়ে সেখান থেকে ফ্লাইট ধরেন।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে তিনি আর উপসাগরীয় হাব ব্যবহার করবেন না—কারণ এই অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর তার "বিশ্বাস নেই"।
গালফ মডেলের উত্থান
ইয়ানের মতো যাত্রীদের এই মনোভাবই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
দুবাই নিজেই এখন বড় পর্যটন ও ব্যবসাকেন্দ্র হলেও, উপসাগরীয় হাবগুলো দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের অর্ধেকের বেশি কেবল ট্রানজিটের জন্য সেখানে আসে।
এভিয়েশন শিল্পের তথ্যদাতা প্রতিষ্ঠান ওএজি-র তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দুবাইয়ের ৪৭%, আবুধাবির ৫৪% এবং দোহার ৭৪% যাত্রী ছিল সংযোগ ফ্লাইটের যাত্রী।
এই মডেল অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শহর থেকে যাত্রী এনে উপসাগরীয় একটি কেন্দ্রে মিলিত করা হয় এবং সেখান থেকে আবার দূরবর্তী গন্তব্যে পাঠানো হয়। ফলে বোস্টন থেকে বালি বা আমস্টারডাম থেকে আন্টানানারিভো—একটি বিরতি দিয়েই যাওয়া সম্ভব হয়।
এই ব্যবস্থা প্রচলিত "হাব-অ্যান্ড-স্পোক" বা সরাসরি "পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট" মডেলের থেকে আলাদা। এটি ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল একটি অনন্য ব্যবস্থা।
"হাব-অ্যান্ড-স্পোক" মডেলে আঞ্চলিক স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইটের মাধ্যমে যাত্রীদের বড় হাব বিমানবন্দরে আনা হয় এবং সেখান থেকে তাদের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক রুটের দূরপাল্লার বড় উড়োজাহাজে স্থানান্তরিত করা হয়। আবার পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট" মডেলে যাত্রীরা সাধারণত ছোট আকারের উড়োজাহাজে এক শহর থেকে অন্য শহরে সরাসরি দীর্ঘ দূরত্বের ভ্রমণ সম্পন্ন করেন।
উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর এই কৌশলটি যাত্রীদের জন্য "পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট" ব্যবস্থার কিছু সুবিধা—যেমন সরলতা ও কম ঝামেলা—এবং "হাব-অ্যান্ড-স্পোক" মডেলের সঙ্গে যুক্ত বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বড় পরিসরের অর্থনৈতিক সুবিধা—দুটোকেই একত্রিত করেছে। এটি একটি অনন্য মডেল, যা অনেকাংশেই ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান—মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে হওয়ায়—এই মডেলকে সফল করেছে।
"উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তিন ঘণ্টার ফ্লাইট দূরত্বের মধ্যেই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং চীনের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। এটি একটি বিশাল বাজার," বলেন আবুধাবিভিত্তিক ইতিহাদ এয়ারওয়েজ-এর সাবেক প্রধান নির্বাহী জেমস হোগান। তিনি ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১১ বছর প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করা এয়ারলাইনটির দ্রুত সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তত্ত্বাবধান করেছেন।
তিনি বলেন, "উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো শুধু হাব শহর বা রাজধানীগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বড় আঞ্চলিক শহর এবং তৃতীয় স্তরের শহরগুলো নিয়েও একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, যা এক স্টপেই যাত্রা সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করেছে।"
এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন অ্যাডভোকেসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান্ড্রু চার্লটন। তিনি বলেন, "বর্তমান প্রযুক্তির সহায়তায় উপসাগরীয় অঞ্চল এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে পৃথিবীর প্রায় যেকোনো জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব।"
ফলে চলতি শতকের শুরুর দিকে এই ভৌগোলিক সুবিধা উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোকে চীন ও ভারতের মতো দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর সুযোগ কাজে লাগাতে বিশেষ সুবিধা দেয়। আর এসব বাজারকে ইউরোপীয় ও আমেরিকান এয়ারলাইনগুলো শুরুতে যথাযথ গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, "এভিয়েশনের উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্য হঠাৎ করেই একদম উপযুক্ত অবস্থানে চলে আসে, যা আটলান্টিকের অনেক পূর্বে অবস্থিত।"
এভিয়েশন শিল্পে তুলনামূলক নতুন হওয়ায় উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো তাদের গড়ে তোলা মডেলের উপযোগী আধুনিক উড়োজাহাজ বহরে বিনিয়োগ করতে পেরেছিল। শুরুতে দুই-ইঞ্জিনবিশিষ্ট বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয় এর প্রায় ৩০০ আসনের ধারণক্ষমতা এবং ৭,০০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি পাড়ি দেওয়ার সামর্থ্যের কারণে। পরবর্তীতে এয়ারবাস-এ৩৮০ সুপারজাম্বো উড়োজাহাজটিও উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই বিমানটি পাঁচ শতাধিক যাত্রী বহনে সক্ষম এবং যেসব ব্যস্ত বিমানবন্দরে উড্ডয়ন ও অবতরণের স্লট সীমিত, সেখানে এটি পাঠানো কার্যকর সমাধান হিসেবেই কাজ করে।
জেমস হোগান বলেন, "সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে একেবারে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ থেকে—এটাই ছিল সাফল্যের মূল রহস্য। এর ফলে এমন একটি সেবা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রচলিত বাজারের এয়ারলাইনগুলোর পক্ষে সহজে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হয়নি।"
এর ফল হিসেবে একবিংশ শতকের শুরু থেকে উপসাগরীয় এয়ারলাইন ও তাদের সংশ্লিষ্ট হাবগুলো দ্রুত বিকশিত হয়ে দীর্ঘ দূরত্বের বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে।
ওএজি-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জন গ্রান্ট বলেন, "এটি এমন একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে আগত যাত্রীরা এসে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং বা ভারতীয় উপমহাদেশগামী অন্য ফ্লাইটে ওঠেন।"
তিনি আরও বলেন, "এটি অত্যন্ত দক্ষ ও কার্যকর একটি ব্যবস্থা, যেখানে এক ঘণ্টার মধ্যে ৯০ থেকে ১০০টি ফ্লাইট এসে পৌঁছায় এবং এক বা দুই ঘণ্টার মধ্যে সেগুলো আবার অন্য গন্তব্যে ছেড়ে যায়।"
এই পুরো ব্যবস্থার প্রভাব দীর্ঘ দূরত্বের বিমান ভাড়ার ওপরও পড়েছে।
আন্ড্রু চার্লটন বলেন, "প্রতিযোগিতা ভাড়া কমিয়ে এনেছে, আর উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো ছিল এই প্রতিযোগিতার বড় পরিবর্তনকারী শক্তি। তারা দীর্ঘ দূরত্বের বাজারে সক্ষমতা বাড়িয়েছে, নতুন বাজার তৈরি করেছে—ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিমান ভাড়া কমেছে।"
তবে টেক্সাসের বেকার ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন মনে করেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত এই পুরো ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যাত্রীদের উপসাগরীয় হাবগুলো এড়িয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে এবং এয়ারলাইনগুলোর কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তার ভাষায়, "সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এই ব্যবসায়িক মডেল প্রশ্নের মুখে পড়বে। যদি মানুষ ভ্রমণে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে—যেমন মাঝপথে আটকে পড়ার আশঙ্কা বা যে কোনো সময় ড্রোন হামলার কারণে বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়—তাহলে সেটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।"
ভাড়ার ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় হাবগুলোর ওপর নির্ভরতা কমে যেতে পারে, ফলে বিকল্প রুট—যেমন সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, হংকং বা টোকিও গুরুত্ব পেতে পারে।
এর ফলে বৈশ্বিক বিমান ভাড়াও বাড়তে পারে, কারণ উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভাড়া কমিয়ে রেখেছিল।
ইউরোপীয় এয়ারলাইনগুলো ইতোমধ্যে তাদের ফ্লাইট সূচিতে পরিবর্তন এনেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালু করেছে, আর লুফথানসা ও এয়ার ফ্লান্স-কেএলএম এশিয়ায় ফ্লাইট বাড়িয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—বৈশ্বিক বিমান চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের সুনাম কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে কতটা ধাক্কা খেয়েছে।
অ্যান্ড্রু চার্লটনের মতে, এর অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। তিনি বলেন, যদি দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তবে উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো খুব দ্রুত হারানো অবস্থান ফিরে পাবে, কারণ "তারা সস্তা বিমান ভাড়ায় বাজার ভরে দেবে।"
সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই "যাত্রীরা বিকল্প পথ খুঁজে নেবে"—যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারলাইনগুলো বিকল্প হাব ব্যবহার করে সংযোগ দেবে।
তবে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন(আইএটিএ)-এর মহাপরিচালক উইলি ওয়ালশ মনে করেন, ইউরোপীয় এয়ারলাইনগুলোর পক্ষে উপসাগরীয় ক্যারিয়ারদের জায়গা পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, বৈশ্বিক মোট সক্ষমতার প্রায় ৯.৫ শতাংশই এই এয়ারলাইনগুলোর দখলে।
মার্চের মাঝামাঝি প্যারিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, "উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর যে সক্ষমতা, তা ইউরোপীয় এয়ারলাইন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।" একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি শান্ত হলে উপসাগরীয় বিমান চলাচল দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।
'গালফ ড্রিম'-এর সমাপ্তি?
উপসাগরীয় মডেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছে—বিশেষ করে কোভিড মহামারির সময়, যখন অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেছিলেন, দীর্ঘ দূরত্বের রুট ও ট্রানজিট যাত্রীনির্ভর বড় উড়োজাহাজভিত্তিক এয়ারলাইনগুলো দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে না।
কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেছে, এমিরেটস, ইতিহাদ এবং কাতার এয়ারওয়েজ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভালো মুনাফা করেছে এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে।
ওএজি-এর বিশ্লেষক জন গ্রান্ট বলেন, "এভিয়েশন শিল্প সার্স, কোভিড, ভূরাজনৈতিক সংকট—সবই দেখেছে। শেয়ারবাজার ধসও দেখেছে। তারপরও এটি ঘুরে দাঁড়ায়।"
তবে ঝুঁকিটা শুধু এভিয়েশন শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুবাই কেবল ট্রানজিট কেন্দ্র নয়, বরং নিজস্বভাবে ব্যবসা ও পর্যটনের একটি বৈশ্বিক হাবে পরিণত হয়েছে।
জেমস হোগান বলেন, "উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-গ্যাস খাত শক্তিশালী হলেও, বৈচিত্র্য আনা সবসময়ই তাদের অগ্রাধিকার ছিল। বিমান চলাচল হাব তৈরি সেই বৈচিত্র্য আনার একটি বড় পদক্ষেপ, কারণ এটি অর্থনীতিতে অনুঘটকের মতো কাজ করেছে।"
এ বিষয়ে একমত ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন। তার মতে, আরব আমিরাত নিজেকে এমন একটি গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে মানুষ বসবাস, কাজ ও ব্যবসা করতে আগ্রহী—আর এর বড় অংশই দুবাইয়ের আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
তবে যদি দ্রুত আকাশপথ স্বাভাবিক না হয়, তাহলে এই সমৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়তে পারে—বিশেষ করে পর্যটন খাত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকবে।
ভ্রমণ সংস্থা ট্রিভাগো-এর প্রধান নির্বাহী জোহানেস থমাস বলেন, "নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মনে যে ধারণা তৈরি হয়, তার কারণে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকতে পারে।" তার মতে, এই উদ্বেগ পুরোপুরি কাটতে "দুই থেকে তিন বছর" সময় লাগতে পারে।
তবে জেমস হোগান এ বিষয়ে অনেক বেশি আশাবাদী।
তিনি বলেন, "এটি বড় ধরনের সংকট, তবে একসময় এর সমাধান হবে। অতীতেও এমন হয়েছে। শুরুতে কিছু মানুষ দ্বিধায় থাকতে পারে, কিন্তু যাত্রীরা আবার ফিরে আসবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী।"
স্বল্পমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত উপসাগরীয় এয়ারলাইন ও তাদের নির্ভরশীল হাবগুলোর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের কাছে অঞ্চলটি এখন কিছুটা শঙ্কার জায়গা হয়ে উঠেছে।
তবে এই সুনাম পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন সংঘাত প্রশমিত হবে। যদি উপসাগরীয় অঞ্চল আবারও বৈশ্বিক সংযোগকেন্দ্র হিসেবে তার ভূমিকা ফিরে পায়, তাহলে এভিয়েশন শিল্প আগের মতোই চলতে পারবে। কিন্তু তা সম্ভব না হলে, বৈশ্বিক দূরপাল্লার বিমান চলাচলের ওপর এর প্রভাব হতে পারে গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
