বিক্ষোভ উসকে দিতে ইরানে পরিকল্পিতভাবে ডলার সংকট সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র: নেপথ্যের কারণ ও প্রভাব
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, ইরানি রিয়ালের মান ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়ে দেশটিতে বিক্ষোভ উসকে দিতে পরিকল্পিতভাবে ইরানে ডলারের সংকট তৈরি করেছিল ওয়াশিংটন।
তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর অন্যতম বৃহত্তম সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে পড়ে। মূলত চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামতে বাধ্য করে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান রেকর্ড পরিমাণ কমে যায়। এর প্রতিবাদে ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। শিগগিরই এ আন্দোলন অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সরকার। সরকারি বাহিনীর ব্যাপক অভিযানে অন্তত ১৫০ শিশুসহ ৬ হাজার ৮০০-রও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যা বলেছেন
গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে ইরানকে মোকাবিলা করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানি মুদ্রার মান কমিয়ে দেওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
বেসেন্ট বলেন, 'আমরা ট্রেজারি বিভাগ থেকে যা করেছি, তা হলো: দেশটিতে ডলারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা।' গত ডিসেম্বরে পূর্ণতা পায় ইরানের অন্যতম বৃহৎ একটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে এ কৌশল পূর্ণতা পায় বলে জানান তিনি।
এর ফলে, 'ইরানি মুদ্রার মান হু হু করে পড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয় এবং ফলশ্রুতিতে আমরা ইরানি জনগণকে রাজপথে নেমে আসতে দেখেছি।'
মার্কিন অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ইরানের নেতারা 'পাগলের মতো দেশ থেকে টাকা পাচার করেছেন'।
এর আগে গত মাসে ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট ইরানে সাম্প্রতিক দেশব্যাপী বিক্ষোভে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভূমিকা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রেজারি বিভাগকে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তা সফল হয়েছে। কারণ ডিসেম্বরে তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। তারা পণ্য আমদানি করতে পারছে না; এ কারণেই মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে।'
উভয় ক্ষেত্রেই বেসেন্ট গত বছরের মার্চে ইকোনমিক ক্লাব অভ নিউ ইয়র্ক-এ দেওয়া বক্তব্যের সূত্র টানেন। সেখানে তিনি রূপরেখা দিয়েছিলেন, কীভাবে ট্রাম্পের 'সর্বোচ্চ চাপ' প্রয়োগের কৌশল কাজে লাগিয়ে ইরানের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে হোয়াইট হাউস।
সেই ভাষণে বেসেন্ট বলেছিলেন, ইরানের তেল রপ্তানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপকে টার্গেট করেছে। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ইরানের প্রবেশাধিকার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
'ডলার সংকট' আসলে কী?
কোনো দেশের যখন বিশ্ববাজার থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার জন্য পর্যাপ্ত মার্কিন ডলার থাকে না, সেই অবস্থাকে বলা হয় 'ডলার সংকট'।
বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলার প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই জ্বালানি তেল, ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় ও আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রতিটি দেশেরই এই মুদ্রার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়।
যদি কোনো দেশের রপ্তানি আয় কমে যায় এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যায়, তবে ডলারের তীব্র দুষ্প্রাপ্যতা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাবে স্থানীয় মুদ্রার মান পড়ে যায়, আমদানি পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতি চলে যায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
জার্মানির মারবুর্গ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান বলেন, ইরানে এই ডলার সংকট তৈরি করা হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা আসার প্রধান দুটি পথ—তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার—একসঙ্গে বন্ধ করে দিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল খাতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফলে বিশ্বের যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান ইরানের তেল বেচাকেনা করলে মার্কিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
ইরান যেহেতু তার আয়ের সিংহভাগের জন্য তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই এই নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে চরম বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ফেলে দিয়েছে।
ফারজানেগান বলেন, 'সেকেন্ডারি (পরোক্ষ) নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ডলারে লেনদেনকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকি দিয়ে ইরানের বিদেশের রিজার্ভ আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন কোনো ডলার প্রবেশ করতে পারছে না এবং বিদ্যমান রিজার্ভও ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না।'
ইরানে ডলার সংকটের প্রভাব কী ছিল?
জানুয়ারিতে ইরানি রিয়ালের মান নেমে প্রতি ডলারে ১৫ লাখে দাঁড়ায়। অথচ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল মাত্র ৭ লাখ, ২০২৫-এর মাঝামাঝি সময়ে ছিল ৯ লাখ।
মুদ্রার এই নজিরবিহীন পতনের ফলে দেশটিতে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, যার ফলে খাদ্যপণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় গড়ে ৭২ শতাংশ বাড়ে।
২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। এর আওতায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।গত জানুয়ারিতে ফের নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে এবং তেহরানকে পারমাণবিক ও আঞ্চলিক নীতি নিয়ে আবার আলোচনায় বসাতে 'সর্বোচ্চ চাপ' আরও বাড়িয়ে দেন। গত মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যেসব দেশ ইরানের সাথে ব্যবসা করবে তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করা হবে।
অর্থনীতিবিদ ফারজানেগান বলেন, ডলার সংকট তৈরি করে ইরানকে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা থেকে কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে তীব্র 'আমদানি সংকোচনের' দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে 'ইরান তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য ও যন্ত্রপাতি কেনার পেমেন্ট করতে পারছে না।'
ফারজানেগান আরও বলেন, এই কৌশলে 'মানবিক প্রয়োজনের বিপরীতে বাণিজ্যিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে' হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওয়াশিংটনের এ কৌশলের ফলে ইরানের ছোট বাজার যেকোনো কোম্পানির জন্য 'বাণিজ্যিক দায় বা বোঝা' হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যদি কেবল ওষুধের মতো জরুরি পণ্য নিয়েও কাজ করতে চায়, তবু তারা ঝুঁকির ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে।
ফারজানেগান ও ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবির এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপ না থাকলে ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার বার্ষিক গড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ হারে বাড়ত। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকাণ্ডের কারণে দেশটিতে মধ্যবিত্ত জনসংখ্যার হার প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, 'মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে, তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় নিমেষেই শেষ হয়ে গেছে। এটি মূলত দেশটির মানবসম্পদের দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসযজ্ঞ।'
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতাও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, উচ্চমাত্রার দুর্নীতি ও তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশটির অর্থনীতিকে আগে থেকেই ভঙ্গুর করে রেখেছিল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যখন বাইরে থেকে বড় ধাক্কা দিয়েছে, তখন অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে সরকারের কাছে সেই আঘাত সামলানোর মতো কোনো আর্থিক সক্ষমতা ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী—তারা কি সফল হবে?
ওয়াশিংটন যে পরিকল্পিতভাবে 'ডলার সংকট' তৈরি করেছে, বেসেন্টের এই স্বীকারোক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র এখন এক ধরনের 'পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক যুদ্ধ' শুরু করেছে। গত মাসে ডাভোসে বেসেন্ট বলেছিলেন, 'এটি হলো অর্থনৈতিক কূটচাল; এখানে কোনো গুলি চালানোর প্রয়োজন নেই।'
ফারজানেগান মনে করেন, এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানকে জটিল করে তুলতে পারে। কারণ এ কৌশলে একটি দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে যখন ধসিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়, তখন খাদ্য ও ওষুধের জন্য রাখা তথাকথিত 'মানবিক পথগুলো' আসলে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক মার্কিন অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইন আল জাজিরাকে বলেন, এ ধরনের অর্থনৈতিক জবরদস্তি 'সূর্য পূর্ব দিকে ওঠা আর পশ্চিম দিকে অস্ত যাওয়ার মতোই নিয়মিত ঘটনা।' তিনি রাশিয়া, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, চীন ও মিয়ানমারের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার উদাহরণ দেন।
তবে ফারজানেগানের মতে, অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানের বিষয়টি অনন্য। কারণ এখানে চাপের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা অনেক বেশি। রাশিয়ার রপ্তানি খাত বেশ বৈচিত্র্যময় এবং তাদের রিজার্ভও অনেক বড়। কিন্তু ১৯৭৯ সালে বর্তমান নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কয়েক দশক ধরে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করছে ইরান।
তিনি বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার জন্য ইরানের একটি অত্যন্ত দক্ষ অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা এই ডলার সংকটকে বড় ধাক্কার বদলে ইঁদুর-বেড়াল খেলায় পরিণত করেছে।'
বর্তমানে আরব সাগরে মার্কিন নৌবহর মোতায়েন রয়েছে, অন্যদিকে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশ আলোচনায় বসেছে। ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তিন দাবি হলো: পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করা ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেয়া বন্ধ করা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আসলে ইরানে সরকার পরিবর্তন দেখতে চায়।
তবে ব্রুস ফেইন তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো সরকারকে উৎখাত করা গেছে। বাইরে থেকে সরকার পরিবর্তন করতে সাধারণত সামরিক শক্তির প্রয়োজন হয়।
ইরানের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডলার সংকট দিয়ে দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব বা রেভোল্যুশনারি গার্ডকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না। বরং ইরানিদের দারিদ্র্য একটি সফল বিপ্লবের সম্ভাবনাকে আরও কমিয়ে দেবে। কারণ, তখন মানুষের কাছে 'বিপ্লবের চেয়ে প্রতিদিনের বেঁচে থাকাই হবে প্রধান অগ্রাধিকার'।
