‘ডুমসডে ক্লক’ এর সময় পরিবর্তন; মহাপ্রলয় থেকে পৃথিবী এখন মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে!
পরমাণু যুগের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা 'ডুমসডে ক্লক' বা কেয়ামতের ঘড়ি তৈরি করেছিলেন। এটি একটি প্রতীকী ঘড়ি। মানবজাতি বিশ্ব ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তা বোঝাতেই এই ঘড়ির সৃষ্টি। প্রায় আট দশক পর, মঙ্গলবার এই ঘড়ির কাঁটা নতুন করে সেট করা হয়েছে। এখন ঘড়িতে মধ্যরাত হতে বাকি মাত্র ৮৫ সেকেন্ড।
'বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস' ১৯৪৭ সালে এই ঘড়ি চালু করেছিল। তাদের মতে, ঘড়ির কাঁটা এর আগে কখনোই মধ্যরাতের এত কাছে আসেনি। এই ঘড়িতে মধ্যরাত বা রাত ১২টা মানে হলো সেই মুহূর্ত, যখন পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
এই 'সেকেন্ড' আসলে সময়ের কোনো সাধারণ হিসাব নয়, বরং এটি মহাবিপদের প্রতীকী দূরত্ব। মধ্যরাত বা রাত ১২টা বাজার অর্থ যদি হয় পৃথিবীর বিনাশ, তবে ৮৫ সেকেন্ড বাকি থাকার মানে হলো মানবজাতি সেই ধ্বংসের একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
গত বছর এই বুলেটিন ঘড়ির কাঁটা ঠিক করেছিল মধ্যরাতের ৮৯ সেকেন্ড আগে। ওই সময় পর্যন্ত সেটিই ছিল ধ্বংসের সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এটি ছিল ৯০ সেকেন্ডে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ২০২৫ সালে এসে সময়টা আরও এগিয়ে এনেছেন। এর কারণ হলো পরমাণু ঝুঁকি, জলবায়ু সংকট, এবং জৈবিক হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বের অপর্যাপ্ত অগ্রগতি। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো 'বিপজ্জনক প্রযুক্তি'র প্রসারও এর জন্য দায়ী। বিজ্ঞানীরা ভুল তথ্য, অপপ্রচার এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তারকেও মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বুলেটিনের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলেকজান্দ্রা বেল এই সময় পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, 'মানবজাতি অস্তিত্বের ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় যথেষ্ট উন্নতি করতে পারেনি। ডুমসডে ক্লক হলো এমন একটি মাধ্যম, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি দিয়েই বিশ্ব ধ্বংসের কতটা কাছে পৌঁছে গেছি। পারমাণবিক অস্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিপজ্জনক প্রযুক্তির ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। প্রতিটি সেকেন্ড এখন গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের হাতে সময় ফুরিয়ে আসছে।'
বেল আরও বলেন, 'এটি একটি কঠিন সত্য, কিন্তু এটাই আমাদের বাস্তবতা।'
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বুলেটিনের বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. ড্যানিয়েল হোলজ কথা বলেন। তিনি জানান, গত বছরই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন যে অস্তিত্বের ঝুঁকি কমাতে দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে হাঁটতে হবে।
ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক হোলজ বলেন, 'সতর্কবার্তায় কান না দিয়ে বড় দেশগুলো আরও বেশি আগ্রাসী ও জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর একাধিক সামরিক অভিযান। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ সংক্রান্ত শেষ চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে যাবে। গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে এই প্রথমবার অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকানোর মতো কিছুই থাকছে না।'
হোলজ আরও যোগ করেন, 'জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও মারাত্মক বিপদ রয়ে গেছে। বিশেষ করে 'সিন্থেটিক মিরর লাইফ' তৈরির মতো নতুন ক্ষেত্রগুলোতে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক জৈবিক হুমকির জন্য বিশ্ব এখনো অপ্রস্তুত।'
এআই টুলের দ্রুত বৃদ্ধি এবং ব্যবহারের কোনো নিয়মকানুন না থাকায় ভুল তথ্য ও অপপ্রচার হু হু করে বাড়ছে। হোলজ বলেন, এটি অন্যান্য সব আসন্ন বিপদকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ডুমসডে ক্লক আসলে কী?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যারা পারমাণবিক বোমা তৈরির 'ম্যানহাটান প্রজেক্ট'-এ কাজ করেছিলেন, সেই বিজ্ঞানীদের একটি দল ১৯৪৫ সালে 'বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস' প্রতিষ্ঠা করেন। এটি একটি অলাভজনক সংস্থা।
সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক হুমকি পরিমাপ করা। তবে ২০০৭ সালে তারা জলবায়ু সংকটকেও তাদের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ৭৯ বছর ধরে প্রতি বছর বুলেটিনের বিজ্ঞানীরা এই ঘড়ির সময় পরিবর্তন করে আসছেন। মানবজাতি ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি, তার ওপর ভিত্তি করে এই সময় ঠিক করা হয়। কোনো বছর সময় বদলায়, আবার কোনো বছর বদলায় না। বুলেটিনের বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের বিশেষজ্ঞরা তাদের স্পনসর বোর্ডের সঙ্গে পরামর্শ করে এই সময় নির্ধারণ করেন। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে আলবার্ট আইনস্টাইন এই স্পনসর বোর্ড গঠন করেছিলেন এবং জে. রবার্ট ওপেনহাইমার ছিলেন এর প্রথম চেয়ারম্যান। বর্তমানে এই বোর্ডে আটজন নোবেল বিজয়ী রয়েছেন, যাদের অনেকেই পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের।
এই ঘড়ি কি সত্যি?
বুলেটিনের মতে, এই ঘড়িটি অস্তিত্বের হুমকিগুলো নিখুঁতভাবে মাপার যন্ত্র নয়। বরং পৃথিবী যেসব কঠিন বৈজ্ঞানিক সংকট মোকাবিলা করছে, তা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করাই এর কাজ। ঘড়ি নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত নন এমন কিছু বিশেষজ্ঞ অবশ্য এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
২০২২ সালে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির পৃথিবী ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাইকেল মান সিএনএনকে বলেছিলেন, 'এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ রূপক।' তিনি উল্লেখ করেন, ঘড়িটি বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিকে এক করে ফেলে, অথচ সেগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং সময়কাল ভিন্ন। তবে তিনি এও বলেন, 'এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলঙ্কারিক মাধ্যম। এটি প্রতি বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই গ্রহে আমাদের অস্তিত্ব কতটা নড়বড়ে।'
২০২২ সালে 'ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্টস'-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এরিন ম্যাকডোনাল্ড সিএনএনকে বলেছিলেন, অস্তিত্বের হুমকি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বুলেটিন প্রতি বছর ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, 'আমি চাইতাম আমরা যেন আবার মধ্যরাতের কয়েক মিনিট আগের সময়ে ফিরে যেতে পারতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেকেন্ডের হিসাব ছাড়া এখন আর বাস্তবতাকে তুলে ধরা সম্ভব নয়।'
২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট নিয়ে কথা বলার সময় ডুমসডে ক্লকের উল্লেখ করেছিলেন।
ঘড়িতে মধ্যরাত বাজলে কী হবে?
ডুমসডে ক্লক কখনোই মধ্যরাতে পৌঁছায়নি। বুলেটিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সিইও র্যাচেল ব্রনসন, যিনি এখন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে আছেন, বলেছেন তিনি আশা করেন এমনটা কখনোই ঘটবে না।
তিনি বলেন, 'ঘড়িতে মধ্যরাত হওয়ার মানে হলো কোনো পারমাণবিক যুদ্ধ বা ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। আমরা কখনোই সেই অবস্থায় যেতে চাই না। আর যদি তা ঘটেও, আমরা তা জানার জন্য বেঁচে থাকব না।'
ঘড়ির কাঁটা কি পেছনে ঘোরানো সম্ভব?
সাহসী এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ডুমসডে ক্লকের কাঁটা পেছনের দিকে ঘোরানো এখনো সম্ভব। আসলে, ১৯৯১ সালে কাঁটাটি মধ্যরাত থেকে সবচেয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। তখন এটি ছিল মধ্যরাত থেকে ১৭ মিনিট দূরে। ওই সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের প্রশাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে 'স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন ট্রিটি' বা কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি সই করেছিল।
ব্রনসন বলেন, 'আমরা বুলেটিনে বিশ্বাস করি, যেহেতু মানুষই এই হুমকিগুলো তৈরি করেছে, তাই মানুষই এগুলো কমাতে পারে। তবে কাজটি সহজ নয় এবং কখনো ছিলও না। এর জন্য সমাজের সর্বস্তরে কঠোর পরিশ্রম এবং বিশ্বব্যাপী অংশগ্রহণের প্রয়োজন।'
ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ কী করতে পারে, সে বিষয়ে বুলেটিনের বিজ্ঞানীরা বলেন, সহকর্মীদের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার শক্তিকে অবমূল্যায়ন করবেন না। আলোচনার সূত্রপাত ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে। আর জনসম্পৃক্ততা নেতাদের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে।
বুলেটিনের সংবাদ ব্রিফিংয়ে ফিলিপিনো সংবাদমাধ্যম র্যাপলারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মারিয়া রেসা বলেন, 'তথ্য ছাড়া সত্য পাওয়া যায় না। সত্য ছাড়া বিশ্বাস থাকে না। এই তিনটি ছাড়া আমাদের কোনো যৌথ বাস্তবতা থাকে না। সাংবাদিকতা থাকে না, গণতন্ত্র থাকে না। এই মুহূর্তে যে আমূল সহযোগিতার প্রয়োজন, তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যৌথ তথ্যকে সম্মিলিত পদক্ষেপের অপারেটিং সিস্টেম বা চালিকাশক্তি হিসেবে ভাবুন।'
অন্যান্য ব্যক্তিগত পদক্ষেপও পরিবর্তন আনতে পারে। জলবায়ু সংকট কমাতে দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারেন। যেমন—গাড়ির বদলে কতটা হাঁটছেন বা ঘর গরম রাখতে কী করছেন। ঋতুভিত্তিক ও স্থানীয় খাবার খাওয়া, খাবারের অপচয় কমানো, পানি সংরক্ষণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং ঠিকঠাক রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার—এসবই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
